ডাল, ভাত ও সবজি জোগানই এখন স্বপ্ন নিম্ন আয়ের মানুষের
- সর্বশেষ আপডেট ১২:২০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 79
অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করেই উত্তপ্ত নিত্যপণ্যের বাজার। খুচরা পর্যায়ে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও দামে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। অসহনীয় দাম চালের বাজারেও দেখা যাচ্ছে। গরিবের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি, আর সরু চাল ৯০ টাকা পর্যন্ত।
অজুহাতের দেশে সবজির দিকে তাকানো এখন বড় দায়। অনেক সবজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজির উপরে। মসুরের ডালের কেজিও ১৫০ টাকা।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ডাল, ভাত ও সবজি জোগানোও এখন স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাতে ডিম তুলতেও সীমার কষ্ট কম নয়। ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। খেটে খাওয়া মানুষের সাধ থাকলেও উচ্চ মূল্যের কারণে মাছ-মাংস কিনতে পারছেন না। উচ্চ মূল্যের কশাঘাতে মধ্যবিত্তরাও পড়েছেন বেকায়দায়।
চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, সবজি থেকে মাছ-মাংস—কোনো কিছুই আগের দামে নেই। প্রতিদিন পণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে। বাজারে গেলেই চোখে পড়ে মানুষের অসহায়ত্ব। এক সময় যে পরিবার মাসের শুরুতেই একসঙ্গে বাজার করত, এখন তা ভাগ করে সপ্তাহে নামিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম করে কিনে কোনো মতে বেঁচে থাকার লড়াটা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিত্যপণ্যের দাম সামলাতে গিয়ে কমছে ভোজনের তালিকাও। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এখন দাওয়াত বা মেহমানদারি যেন বিলাসিতা। কেউ বাড়িতে আসার আগেই মনে পড়ে কেনাকাটার বাজেট। তাই আগেভাগেই ‘না’ করে দিচ্ছেন অনেকেই।
শুধু বাজার খরচ নয়, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ সব খাতে। সব মিলে পণ্যের দাম মেটাতে গিয়ে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে, ফলে মধ্যবিত্তের সাধও বাজারে চাপা পড়ছে। চুলায় হাঁড়ি চাপাতে হিমশিম খাচ্ছেন গরিব মানুষ।
শুক্রবার খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৮ দিনের ব্যবধানে চালের দাম কিছুটা কমলেও এখনও উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৭–৬০ টাকায়। বিআর ২৮ ও পাইজাম চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৮০–৮৫ টাকায় এবং নাজিরশাল চাল ৮৫–৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারে উত্তাপ থামছেই না। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বরবটি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা। ঝিঙ্গার প্রতি কেজি দাম ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধন্দুল ৮০ টাকা, শসা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা। এছাড়া পেঁপে ৩০ টাকা, লাউ ৬০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, টমেটো ১৪০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, গোল বেগুন ১৪০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা, কচু ৬০ টাকা এবং গাজর ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছ-মুরগির দোকানেও একই অবস্থা। সপ্তাহের ব্যবধানে চাষের রুই, তেলাপিয়া ও পাঙাশের দাম ২০–৫০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে চাষের রুই ও কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০–৪২০ টাকায়। তেলাপিয়া ২২০–২৬০ টাকা, পাঙাশ ২০০–২৫০ টাকা। চাষের চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০–৮০০ টাকা, নদীর চিংড়ি ১০০০–১২০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ১৭০–১৮০ টাকা, সোনালি জাতের মুরগি ৩০০–৩২০ টাকা।
ডিমের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা ডজন, গরুর মাংস ৭৫০–৮০০ টাকা, খাসির মাংস সর্বোচ্চ ১২৫০ টাকা।
রাজধানীর নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা ভ্যানচালক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, “বাজারে এসেছি আধা ঘণ্টা হয়েছে, কিন্তু কী রেখে কী কিনব বুঝতে পারছি না। যে টাকা আছে, তা চাল ও ডাল কিনতেই শেষ হয়ে যাবে। পরে টাকা না থাকলে এক পদ সবজিও হয়তো কেনা কঠিন হবে। অনেক পণ্যের দাম শুনে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সারা বছর একই পদ্ধতিতে মূল্য কারসাজি করে ক্রেতাকে ঠকাচ্ছে। তবে সরকারের তরফ থেকে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া ভোক্তাকে স্বস্তিতে রাখতে তদারকি সংস্থাগুলোর কোনো গবেষণা নেই। বাজার তদারকির পরিকল্পনাও নেই। ফলে বছরের পর বছর ভোক্তা নিঃশেষিত হচ্ছে। সরকারের উচিত বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজর দেওয়া।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, “বাজারে অভিযান থেমে নেই। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে প্রতিদিন তদারকি করা হচ্ছে। অসাধুভাবে দাম বাড়ালে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে পণ্যের দাম সহনীয় করা হচ্ছে। ভোক্তাদের স্বার্থে অধিদপ্তরের কার্যক্রম চলমান থাকবে।”
সূত্র: যুগান্তর































