ঢাকা ০৬:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডলার সংকট- চাহিদা পতনে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিতে ধস

বিশেষ প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৩:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
  • / 340

বাংলাদেশের আমদানি কার্যক্রমের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জ্বালানি তেল, ক্লিংকার, বিদেশি ফল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির মতো রাজস্ব আয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখা পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই হ্রাস নিছক সংখ্যাগত নয়—বরং দেশের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোগ–তিনটিই চাপের মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকেত বহন করে।

বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষিখাতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানিতে ব্যাপক পতন ঘটেছে।

ডিজেল আমদানি কমেছে ২১.৬৫%, যা আগের ৩৫.৬৭ লাখ টন থেকে নেমে এসেছে ২৭.৯৪ লাখ টনে। ফার্নেস অয়েল কমেছে ১০.২২%, ২০.৯৫ থেকে ১৮.৮০ লাখ টনে। পেট্রোলিয়াম অয়েল কমেছে ১৬.৭৫%, ১৭.০৫ থেকে ১৪.১৯ লাখ টনে।

এই হ্রাসের পেছনে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ক্যাপটিভ প্ল্যান্টগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়া, এলএনজি ব্যবহার বৃদ্ধি, ডলারের সংকট ও বিল পরিশোধে জটিলতা।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কিছু বেসরকারি খাত থেকে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বসুন্ধরা গ্রুপের বিটুমিন প্ল্যান্ট থেকে প্রাপ্ত উপজাত ডিজেলে ঘাটতি কিছুটা পূরণ হচ্ছে।

সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদান ক্লিংকার আমদানিও হ্রাস পেয়েছে ২.৪৮%। আগের বছর ১,৬৫৮ লাখ টন আমদানির বিপরীতে এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৬১৭ লাখ টনে।

প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানাচ্ছেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মেগা প্রকল্পগুলোর গতি কমেছে, বড় ঠিকাদাররা পলাতক, সরকারি নির্মাণকাজও থেমে আছে—এরই প্রভাব ক্লিংকার আমদানিতে পড়েছে।”

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট

চট্টগ্রাম বন্দরে অন্যতম রাজস্ব জোগানদাতা ছিল বিদেশি ফল—বিশেষত আপেল ও কমলা জাতীয় ফল। তবে, আপেল আমদানি কমেছে ১১.২৭%, ১.৫৭ লাখ টন থেকে ১.৩৯ লাখ টনে।

মেন্ডারিন (কমলা) কমেছে ২২.৭৬%, ৬৮,৯০৭ টন থেকে ৫৩,২২০ টনে।

শুল্ক বাড়ানো, শতভাগ এলসি মার্জিন নির্ধারণ, এবং ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কারণে অনেক ক্ষুদ্র আমদানিকারক বাজার থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।

ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা আপেলে কেজিপ্রতি ১০৫ টাকা শুল্ক দিচ্ছি, যেখানে আগে ছিল ৯০ টাকা। কমলা ও আঙ্গুরেও কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১৫ ও ২৪ টাকা অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে।”

এ ধস সরাসরি জনগণের ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কারণ দেশে একটানা ৯%–এর ওপরে মূল্যস্ফীতি চলছে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত লোহা ও ইস্পাতজাত পণ্যের আমদানি কমেছে ৪.৪%, দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারে। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ২২%, দাঁড়িয়েছে ২.৪ বিলিয়ন ডলারে।

এটি ভবিষ্যতের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব আদায় করেছে ৭৫ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, আগের বছরের তুলনায় ৯.৭ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে উচ্চ হারে শুল্ক বসানো পণ্যের মাধ্যমে, আমদানির পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়।

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, “যদি আমদানি হ্রাস বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রতিফলন হয়, তাহলে এটি অর্থনীতির জন্য খুবই চিন্তার বিষয়।”

চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানির সামগ্রিক পতন দেশের মন্দা পরিস্থিতিকে নগ্ন করে তুলেছে। চাহিদার স্থবিরতা, ডলারের সংকট, শুল্কের কঠোরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশের বাণিজ্য কাঠামো এখন চরম চাপে। অর্থনীতি সচল রাখতে নীতি নির্ধারকদের জন্য সময় এসেছে কাঠামোগত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ডলার সংকট- চাহিদা পতনে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিতে ধস

সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৩:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

বাংলাদেশের আমদানি কার্যক্রমের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জ্বালানি তেল, ক্লিংকার, বিদেশি ফল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির মতো রাজস্ব আয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখা পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই হ্রাস নিছক সংখ্যাগত নয়—বরং দেশের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভোগ–তিনটিই চাপের মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকেত বহন করে।

বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষিখাতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানিতে ব্যাপক পতন ঘটেছে।

ডিজেল আমদানি কমেছে ২১.৬৫%, যা আগের ৩৫.৬৭ লাখ টন থেকে নেমে এসেছে ২৭.৯৪ লাখ টনে। ফার্নেস অয়েল কমেছে ১০.২২%, ২০.৯৫ থেকে ১৮.৮০ লাখ টনে। পেট্রোলিয়াম অয়েল কমেছে ১৬.৭৫%, ১৭.০৫ থেকে ১৪.১৯ লাখ টনে।

এই হ্রাসের পেছনে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ক্যাপটিভ প্ল্যান্টগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়া, এলএনজি ব্যবহার বৃদ্ধি, ডলারের সংকট ও বিল পরিশোধে জটিলতা।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কিছু বেসরকারি খাত থেকে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বসুন্ধরা গ্রুপের বিটুমিন প্ল্যান্ট থেকে প্রাপ্ত উপজাত ডিজেলে ঘাটতি কিছুটা পূরণ হচ্ছে।

সিমেন্ট তৈরির মূল উপাদান ক্লিংকার আমদানিও হ্রাস পেয়েছে ২.৪৮%। আগের বছর ১,৬৫৮ লাখ টন আমদানির বিপরীতে এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১,৬১৭ লাখ টনে।

প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানাচ্ছেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মেগা প্রকল্পগুলোর গতি কমেছে, বড় ঠিকাদাররা পলাতক, সরকারি নির্মাণকাজও থেমে আছে—এরই প্রভাব ক্লিংকার আমদানিতে পড়েছে।”

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট

চট্টগ্রাম বন্দরে অন্যতম রাজস্ব জোগানদাতা ছিল বিদেশি ফল—বিশেষত আপেল ও কমলা জাতীয় ফল। তবে, আপেল আমদানি কমেছে ১১.২৭%, ১.৫৭ লাখ টন থেকে ১.৩৯ লাখ টনে।

মেন্ডারিন (কমলা) কমেছে ২২.৭৬%, ৬৮,৯০৭ টন থেকে ৫৩,২২০ টনে।

শুল্ক বাড়ানো, শতভাগ এলসি মার্জিন নির্ধারণ, এবং ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার কারণে অনেক ক্ষুদ্র আমদানিকারক বাজার থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।

ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা আপেলে কেজিপ্রতি ১০৫ টাকা শুল্ক দিচ্ছি, যেখানে আগে ছিল ৯০ টাকা। কমলা ও আঙ্গুরেও কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১৫ ও ২৪ টাকা অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে।”

এ ধস সরাসরি জনগণের ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতাও প্রকাশ করে। কারণ দেশে একটানা ৯%–এর ওপরে মূল্যস্ফীতি চলছে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত লোহা ও ইস্পাতজাত পণ্যের আমদানি কমেছে ৪.৪%, দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারে। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ২২%, দাঁড়িয়েছে ২.৪ বিলিয়ন ডলারে।

এটি ভবিষ্যতের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব আদায় করেছে ৭৫ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা, আগের বছরের তুলনায় ৯.৭ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে উচ্চ হারে শুল্ক বসানো পণ্যের মাধ্যমে, আমদানির পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়।

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, “যদি আমদানি হ্রাস বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রতিফলন হয়, তাহলে এটি অর্থনীতির জন্য খুবই চিন্তার বিষয়।”

চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানির সামগ্রিক পতন দেশের মন্দা পরিস্থিতিকে নগ্ন করে তুলেছে। চাহিদার স্থবিরতা, ডলারের সংকট, শুল্কের কঠোরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশের বাণিজ্য কাঠামো এখন চরম চাপে। অর্থনীতি সচল রাখতে নীতি নির্ধারকদের জন্য সময় এসেছে কাঠামোগত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার।