ঢাকা ১২:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডনা দিলরুবা আখতারের ‘দাদু’

রীতা ভৌমিক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:১৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 7

ডনা দিলরুবা আখতারের ‘দাদু’

লেখক ডনা দিলরুবা আখতারের লেখা পাঁচ প্রজন্মের একটি পারিবারিক, ঐতিহাসিক কাহিনি ‘দাদু’। ৩৫২ পৃষ্ঠার বইটি লেখক ১২টি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। এতে দাদুর জীবনপ্রবাহ, ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তানের দেশ ভাগ, দাদু-নাতনির মিষ্টি সম্পর্ক, পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মনোভাব, ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ইত্যাদি বিষয় গুলো লেখক বইতে তুলে ধরেছেন।

বইয়ের মূল চরিত্র স্বনামধন্য চিকিৎসক ডা. মহসিন আলী। লেখকের দাদু। লেখক দাদুর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শৈশব- কৈশোর, শিক্ষা জীবন, কর্মজীবন, বহরামপুরে তার শ্বশুর- শাশুড়ির স্নেহে বড় সন্তান শেফালির বেড়ে ওঠা , দেশভাগের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসা এবং নাতি-নাতনিদের জীবন যাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে, পাঁচ প্রজন্মের কথা আন্তরিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক তার নিজস্ব সাবলীল বাচনভঙ্গীতে।

 

ডা. মহসিন আলীর মেজো কন্যা লোলো লেখকের মা। তার মেজ জামাতা স্বচ্ছল পরিবারে সন্তান ছিলেন না। এরপরও দাদু তার মেজো কন্যাকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার আব্দুল মজিদ খন্দকারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পরও বড় ভাইয়ের সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা লেখক এর মামনি সুদক্ষ হাতে সংসার সামলিয়েছেন। সংসারের টানাটানি কখনো স্বামীকে বুঝতে দেন নি।

 

মেয়ের বিয়ের পরপরই ১৯৫০ সালে ডা. মহসিন আলী ভারতের কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে চলে আসেন। এখানে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রথমে তিনি চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরায় একটি ভাড়া বাঁশের বাড়িতে অবস্থান করেন। বড় মেয়েকে ঢাকায় পড়ার ব্যবস্থা করে বাকি চার সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামেই থিতু হন। সেখানেই তিনি নতুন করে ডাক্তারি প্র্যাকটিস শুরু করেন। নতুন একটি দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে দাদু মানিয়ে নেওয়ার ধৈর্য্য-শক্তি, ক্ষমতা লেখককে মোহিত করেছে।

 

প্রথম স্ত্রী নুরুন নাহার মারা যাওয়ার পর দাদুর একাকিত্বের কারণে শাগুফতা নামে একজন শিক্ষিকাকে বিয়ে করেন। সেই বিয়ে পরিবারের সদস্যদের মেনে না নেওয়ায় সন্তানদের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যা দাদুকে কষ্ট দিয়েছে। যা তার দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলে। বছরখানেকের মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী অসুস্থতায় মারা যাওয়া। সব কিছু তাকে আবার একাকীত্বের দিকেই ঠেলে দেয়।

 

ওই বছরই তিনি আবার নূরজাহান বেগম নামে একজনকে বিয়ে করেন। যার আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সন্তান না হওয়ায় তিনি অনেক তিরস্কারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার হয়েছেন। সে সংসার তার সুখের হয়নি। কিন্তু দাদুর সাথে বিয়ের পর তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান না হওয়ার দোষ যে সমাজ নারীর উপর চাপিয়ে দেয়। সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে সেই সমাজকে নূরজাহান বেগম চপেটাঘাত করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন সন্তান না হলে সমাজ একজন নারীকেই শুধু দোষারোপ করে, কিন্তু একজন পুরুষও যে সন্তান জন্ম দানে অক্ষম হতে পারেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পরিবার তা মানতে পারেনা।

 

দাদু ভারত থেকে চলে আসার সময় তিনি তার স্বপ্নের কলকাতার ডাক্তারখানা ডাক্তার জামাতার হাতে দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু জামাতার বিহারের জামালপুরে মফস্বল শহরে পোস্টিং হয়। ১৯৬০ সালে জামাতাও সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন।

 

লেখক ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানে কাটানো তার আনন্দময় শৈশবের দিনগুলোর কথাও তুলে ধরেছেন। তেমনি লেখক নিজের দাদুর সামাজিক, পারিবারিক, কর্মজীবনের প্রতি দায়িত্ববোধের কথাও অবলীলায় বইয়ে তুলে ধরেছেন।

 

অন্যদিকে লেখক শৈশবে জামালপুরে স্থানীয় একজন দাদুর সঙ্গে কাটানো সময়, ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সবাই মিলে আনন্দ করা, খেলাধুলা করা, স্কুলে আমেরিকান সহপাঠীর সাথে বন্ধুত্ব, প্রবাসী জীবনের কথা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

দুই পর্বে বইয়ে তার দাদু, নানি, বাবা-মা, খালা-মামা, ভাইবোনদের আলোকচিত্রও তুলে ধরেছেন।
বইটি প্রকাশ করেছে যুক্ত প্রকাশন। জানুয়ারি ২০২৬।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ডনা দিলরুবা আখতারের ‘দাদু’

সর্বশেষ আপডেট ০৮:১৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

লেখক ডনা দিলরুবা আখতারের লেখা পাঁচ প্রজন্মের একটি পারিবারিক, ঐতিহাসিক কাহিনি ‘দাদু’। ৩৫২ পৃষ্ঠার বইটি লেখক ১২টি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। এতে দাদুর জীবনপ্রবাহ, ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তানের দেশ ভাগ, দাদু-নাতনির মিষ্টি সম্পর্ক, পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মনোভাব, ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ইত্যাদি বিষয় গুলো লেখক বইতে তুলে ধরেছেন।

বইয়ের মূল চরিত্র স্বনামধন্য চিকিৎসক ডা. মহসিন আলী। লেখকের দাদু। লেখক দাদুর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শৈশব- কৈশোর, শিক্ষা জীবন, কর্মজীবন, বহরামপুরে তার শ্বশুর- শাশুড়ির স্নেহে বড় সন্তান শেফালির বেড়ে ওঠা , দেশভাগের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসা এবং নাতি-নাতনিদের জীবন যাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে, পাঁচ প্রজন্মের কথা আন্তরিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক তার নিজস্ব সাবলীল বাচনভঙ্গীতে।

 

ডা. মহসিন আলীর মেজো কন্যা লোলো লেখকের মা। তার মেজ জামাতা স্বচ্ছল পরিবারে সন্তান ছিলেন না। এরপরও দাদু তার মেজো কন্যাকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার আব্দুল মজিদ খন্দকারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পরও বড় ভাইয়ের সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা লেখক এর মামনি সুদক্ষ হাতে সংসার সামলিয়েছেন। সংসারের টানাটানি কখনো স্বামীকে বুঝতে দেন নি।

 

মেয়ের বিয়ের পরপরই ১৯৫০ সালে ডা. মহসিন আলী ভারতের কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে চলে আসেন। এখানে তার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। প্রথমে তিনি চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরায় একটি ভাড়া বাঁশের বাড়িতে অবস্থান করেন। বড় মেয়েকে ঢাকায় পড়ার ব্যবস্থা করে বাকি চার সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামেই থিতু হন। সেখানেই তিনি নতুন করে ডাক্তারি প্র্যাকটিস শুরু করেন। নতুন একটি দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে দাদু মানিয়ে নেওয়ার ধৈর্য্য-শক্তি, ক্ষমতা লেখককে মোহিত করেছে।

 

প্রথম স্ত্রী নুরুন নাহার মারা যাওয়ার পর দাদুর একাকিত্বের কারণে শাগুফতা নামে একজন শিক্ষিকাকে বিয়ে করেন। সেই বিয়ে পরিবারের সদস্যদের মেনে না নেওয়ায় সন্তানদের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যা দাদুকে কষ্ট দিয়েছে। যা তার দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলে। বছরখানেকের মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী অসুস্থতায় মারা যাওয়া। সব কিছু তাকে আবার একাকীত্বের দিকেই ঠেলে দেয়।

 

ওই বছরই তিনি আবার নূরজাহান বেগম নামে একজনকে বিয়ে করেন। যার আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সন্তান না হওয়ায় তিনি অনেক তিরস্কারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। পারিবারিক সহিংসতার স্বীকার হয়েছেন। সে সংসার তার সুখের হয়নি। কিন্তু দাদুর সাথে বিয়ের পর তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সন্তান না হওয়ার দোষ যে সমাজ নারীর উপর চাপিয়ে দেয়। সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে সেই সমাজকে নূরজাহান বেগম চপেটাঘাত করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন সন্তান না হলে সমাজ একজন নারীকেই শুধু দোষারোপ করে, কিন্তু একজন পুরুষও যে সন্তান জন্ম দানে অক্ষম হতে পারেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পরিবার তা মানতে পারেনা।

 

দাদু ভারত থেকে চলে আসার সময় তিনি তার স্বপ্নের কলকাতার ডাক্তারখানা ডাক্তার জামাতার হাতে দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু জামাতার বিহারের জামালপুরে মফস্বল শহরে পোস্টিং হয়। ১৯৬০ সালে জামাতাও সপরিবারে পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন।

 

লেখক ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানে কাটানো তার আনন্দময় শৈশবের দিনগুলোর কথাও তুলে ধরেছেন। তেমনি লেখক নিজের দাদুর সামাজিক, পারিবারিক, কর্মজীবনের প্রতি দায়িত্ববোধের কথাও অবলীলায় বইয়ে তুলে ধরেছেন।

 

অন্যদিকে লেখক শৈশবে জামালপুরে স্থানীয় একজন দাদুর সঙ্গে কাটানো সময়, ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সবাই মিলে আনন্দ করা, খেলাধুলা করা, স্কুলে আমেরিকান সহপাঠীর সাথে বন্ধুত্ব, প্রবাসী জীবনের কথা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

দুই পর্বে বইয়ে তার দাদু, নানি, বাবা-মা, খালা-মামা, ভাইবোনদের আলোকচিত্রও তুলে ধরেছেন।
বইটি প্রকাশ করেছে যুক্ত প্রকাশন। জানুয়ারি ২০২৬।