টেকনাফে এক সপ্তাহে ৫১ জেলে অপহরণ, আতঙ্কে অন্যরা
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৫৬:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৫
- / 112
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমারের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এবার নাফ নদীতে দৌরাত্ম্য বেড়েছে সংগঠনটির। ফলে বারবার সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা অপহরণের শিকার হচ্ছেন।
গত এক সপ্তাহে ৫২জন বাংলাদেশী জেলেকে মাছ ধরার ট্রলার-নৌকাসহ অপহরন করে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এতে জেলেদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গত ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার দুপুরে দুটি ট্রলারসহ ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এনিয়ে টানা চারদিনে ৪৭ জন জেলে অপহরণের শিকার হন।
জেলেদের অভিযোগ, আরাকান আর্মি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের কাছাকাছি নাফনদীতে নাইক্ষ্যং দিয়া নামক এলাকায় স্পীড বোটে অস্ত্র-সশস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করছে জেলেদের। এ সময় আরাকান আর্মির ধাওয়ায় একটি মাছ ধরা ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এসময় ছয় জেলেকে জীবত উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এছাড়া গত এক সপ্তাহে ৫১ জন জেলে অপহরণের শিকার হন আরাকান আর্মি হাতে।
এ বিষয়ে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট শাকিব মেহবুব বলেন, ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বারবার জেলেদের সতর্ক করার পরও তারা আমাদের জলসীমানা অতিক্রম করে। যার কারনে জেলেরা আরাকান আর্মির হাতে ধরা পরছে।
জেলেদের ভাষ্য মতে, নাফ নদের ওপারে মিয়ানমার অংশেও আরাকান আর্মি প্রায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে। ফলে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেরা বারবার অহরণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া মাঝেমধ্য অপহরণের শিকার জেলেদের ফেরত দিলেও মাছ-জাল লুট করে নিয়ে ফেলেন তারা (আরাকান আর্মি)। গত কয়েক দিনে নাফনদীতে আরাকান আর্মির ধরপাকড়ের কারনে অনেক জেলে ধাওয়া খেয়ে, ঘাটে ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন ট্রলার মালিকরা।
ট্রলার মালিক তারেক উর রহমান বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে ধাওয়া দিয়ে দুটি ট্রলারসহ ১৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। এর একটু দূরে থাকা আমার মাছ ধরার ট্রলারও ছিল। পরে তারা ভয়ে ঘাটে ফিরে আসে। এ রকম অনেকে ট্রলার আরাকান আর্মির ভয়ে কূলে ফিরে আসতে শুরু করেছে।’
ট্রলার মালিক ও বিজিবি জানায়, গত আট মাসে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমারে নাফ নদসহ সংলগ্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩০০ জেলেকে অপহরণ করে আরাকান আর্মি। এরমধ্যে চলতি বছরের মার্চ থেকে ২৬ আগস্ট মাস পর্যন্ত অপহৃত হন ২২০ জন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সহায়তায় এদের মধ্যে প্রায় ২০০ জনকে কয়েক দফায় ফেরত আনা হয়। বাকি ১০০ জন জেলে এখনো তাদের হেফাজতে রয়েছে। এদের মধ্য টানা চার দিনে ৪৬ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।
গত ২৩ আগস্ট টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা সোলতান আহমদের মালিকাধীন ট্রলার ঘাটে ফেরার পথে ১২ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। তিনদিন পার হয়ে গেলেও এখনো তাদের ফেরত দেয়নি।
ট্রলার মালিক সোলতান আহমেদ বলেন, ‘আমার ট্রলারসহ জেলেদের এখনো ফেরত দেয়নি। ফলে জেলেদের পরিবারগুলো আতঙ্কের মধ্য রয়েছে। দীর্ঘদিন পর মাছ ধরার সময়ে এ ধরনের ঘটনা আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। কারন এখন মাছ শিকারের সময় কিন্তু তাদের (আরাকান আর্মির) ভয়ে মাছ শিকারে বের হচ্ছে না জেলেরা। সব মিলিয়ে আমাদের খুব দুর্দিন যাচ্ছে।’
এদিকে নাফনদীতে মাছ শিকার ফেরার পথে নাইক্ষ্যংদিয়ায় ১৭ আগস্ট ৫ জেলে, ২৩ আগস্ট ১২ জেলে, ২৪ আগস্ট ১৪ জেলে, ২৫ আগস্ট ৫ জেলে এবং ২৬ আগস্ট ১৩ জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। এর মধ্য সর্বশেষ গতকাল ২৬ আগস্ট মঙ্গলবার ভাটায় সময় মাছ ধরার শেষে ফেরার পথে টেকনাফের নাইট্যং পাড়ার বাসিন্দা মো. আলম এবং জাদিমুরার বসবাসকারী হেলাল উদ্দিনের দুটি ট্রলারের ১৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি।
এ বিষয়ে ট্রলার মালিক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ভাটার সময় নাব্যতা সংকটের কারনে মাছ ধরার ট্রলাকে মিয়ানমারের সীমান্তের কাছাকাছি দিয়ে চলাচল করতে হয়। গত ১০০ বছর ধরে এভাবে জেলেরা যাতায়াত করে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ নাফনদীতে বেপরোয়া আচরন করছে আরাকান আর্মি। অনকে সময় বাংলাদেশ জলসীমানায় ঢুকে ধাওয়া দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার ট্রলারের থাকা মাঝি অবহিত করেছে তাদের ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এসময় আরও কিছু ট্রলারসহ জেলেও ছিল। সরকারের উচিত এটার একটা সুস্থ সমাধান বের করা। অন্যতায় লাখো জেলে পরিবারে নেমে আসবে দুর্দিন।’
টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথের শাহপরীর দ্বীপের পূর্ব-দক্ষিণে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনা সংলগ্ন নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় বিজিবি ও কোস্টগার্ডের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালীয়া ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে নাফনদীতে আরাকান আর্মি বিচরন বেড়েছে। যার কারনে বারবার জেলেরা ধরা পরছে। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্য আছি। যতি দ্রæত সম্ভব জেলেদের ফিরিয়ে আনা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।’
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘আরাকান আর্মি রেশনসহ মাছ-লুট করতে এ ধরনে কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে আমাদের বিজিবি-কোস্ট গার্ডের টহল-নজরদারীর পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা খুব দরকার যাতে তারা (জেলেরা) জল সীমানা অতিক্রম না করে।’
নাফনদী থেকে জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আজকেও আইনশৃঙ্খলা সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘আরাকান আর্মি হাতে অপহৃত জেলেদের দ্রæত কিভাবে ফেরত আনা যায় সে-বিষয়ে আমাদের বিজিবি-কোস্ট গার্ড কাজ করছে। এছাড়া নাফনদীতে টহল-নজরদারী বাড়ানোর সির্দ্ধান্ত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মূলত নদীতে নাব্যতা সংকটের কারনে ভাটার সময় জেলেদের নাইক্ষ্যংদিয়া নামক জায়গায় হয়ে আসতে মিয়ানমার জলসীমানা অতিক্রম করতে হয়। এই সুযোগে জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কিভাবে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা যায়-সে উপায় খুঁজছি এবং উর্দ্ধতন কতৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করছি।’


































