ট্রাইব্যুনালে সাবেক ৯ মন্ত্রীসহ ৩৯ জন
জুলাই হত্যাকাণ্ড: উত্তাল রাজনীতির গভীর সংকেত
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৩০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
- / 256
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ভয়াবহ গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঢেউয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মুখে পড়ে এবং ৫ আগস্ট তারা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সেই অভ্যুত্থানের সময় এবং পরবর্তী সহিংস পরিস্থিতিতে সংঘটিত নানা হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে চলমান মামলাগুলোর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে জুলাই হত্যাকাণ্ড।
এই হত্যাকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে রোববার (২০ জুলাই) দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৩৯ জন সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে হাজির করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, শিল্পমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীসহ বহু আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
হাজিরা ও আইনি প্রক্রিয়া
রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা জারি করা হয়। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগার, কাশিমপুর ও নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে পৃথক প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। প্রসিকিউশন জানায়, মামলাগুলোর তদন্ত এখনো চলমান থাকায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সময় আবেদন করা হবে এবং চার্জ গঠন এখনই সম্পূর্ণ নয়।
মূল অভিযোগ ও মামলার প্রসঙ্গ
এই মামলাগুলো মূলত জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান চলাকালে এবং সরকার পতনের ঠিক আগে ও পরে সংঘটিত ‘মুগ্ধ হত্যাকাণ্ড’ ও অন্যান্য হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। “মুগ্ধ হত্যা মামলা” বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র মুগ্ধ সরকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে ওই হামলা পরিচালিত হয়, যার নেপথ্যে ছিলেন সরকারদলীয় একাধিক নেতা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
এই ঘটনার পাশাপাশি নরসিংদী, কক্সবাজার, সিলেট, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর এবং খুলনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের সাতটি মামলায় অভিযুক্তরা জড়িত বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
গণআন্দোলনের পটভূমি ও পতনের পথ
২০২৪ সালের মধ্যভাগ থেকে দেশে অসন্তোষ বাড়ছিল। মূল্যস্ফীতি, গুম-খুন, প্রশাসনিক নির্যাতন এবং নির্বাচনবিহীন দীর্ঘকালীন শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণ, বিশেষত ছাত্রসমাজ রাস্তায় নামতে শুরু করে। ২৭ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশ, যার পরেই টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা দেয় ৩০ জুলাইয়ের ধানমন্ডি সংঘর্ষ। এরপর থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থানের সুযোগে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ সরকার।
সরকার পতনের পরে অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা হয়, যেখানে প্রধানত বিচারপতি ও বেসামরিক নেতৃত্ব স্থান পায়। এই প্রশাসন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়।
আসামিদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রোফাইল
এই মামলার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো আসামিদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়। এর মধ্যে: আনিসুল হক: সাবেক আইনমন্ত্রী, ২০০৯ সাল থেকে একাধিক দফা দায়িত্ব পালন করেছেন। ডা. দীপু মনি: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী; দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। সালমান এফ রহমান: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং দেশের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। জিয়াউল আহসান: এনটিএমসির সাবেক পরিচালক এবং গোয়েন্দা মহলে শক্তিশালী পরিচিতি ছিল তার।
তাদের পাশাপাশি এমপি, ডিআইজি, র্যাব কর্মকর্তাও রয়েছেন এই মামলায়। এতসংখ্যক উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিকে একসঙ্গে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবিএই মামলাগুলোর বিষয়ে আওয়ামী লীগপন্থী বিভিন্ন আইনজীবী এবং পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি “প্রতিশোধপরায়ণ বিচার”। তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক বদলার অংশ হিসেবে এসব মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিএনপি ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, “বিচারের নামে প্রতিশোধ নয়, বরং সত্যিকারের বিচার চাই। কিন্তু সেটা যেন প্রমাণ-ভিত্তিক হয় এবং সব গুম-খুনের ঘটনায় যারা জড়িত, তারা যেন দল নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আসে।”

সংবিধান ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
এই বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ঢাকা অফিসও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই জুলাই-আগস্টের ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করেছিল। বর্তমানে বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।
এই বিচারিক প্রক্রিয়া যদি সুষ্ঠু হয়, তবে এটি বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যদি এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে ব্যবহৃত করা হয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের শেখ হাসিনার শাসনামলকে সরিয়ে দেয়ার এক মেটিকুলাস ডিজাইন, যা নিজেই স্বীকার করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই প্রেক্ষাপটে এই ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া শুধু আইনগত নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকেও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।




































