ঢাকা ০২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: সিদ্ধান্ত এখন সরকারের হাতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
  • / 105

জুলাই সনদ

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় বিষয়টি এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সমন্বয় করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

গত বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পঞ্চম ও শেষ দফার আলোচনায়ও গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে কমিশন আগামী ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে।

বৈঠকে ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে বিএনপি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করা সময় ও অর্থের অপচয় হবে। নির্বাচনের দিনই আলাদা ব্যালটে গণভোট নেওয়া যেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদে সব দলের ভিন্নমত স্পষ্টভাবে থাকতে হবে, যাতে নির্বাচনের পর বিজয়ী দল চাইলে তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারে।”

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়াই উত্তম। একই দিনে ভোট হলে বিভ্রান্তি ও জটিলতা তৈরি হবে।” জামায়াতের প্রতিনিধি শিশির মনিরের প্রস্তাব, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ সংবিধান আদেশ জারি করতে হবে, যার তপশিলে সনদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে গণভোট অবশ্যই নির্বাচনের আগে হতে হবে। একই দিনে হলে গণভোটের গুরুত্ব হারাবে।”

আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করে কমিশন সরকারকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে পরামর্শ দেবে। দলগুলোর বেশিরভাগই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একমত হলেও গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে বিভক্ত।”

তিনি জানান, বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি অভিন্ন মত দিয়েছেন—
১. জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিশেষ আদেশ জারি করতে হবে।
২. এই আদেশের ভিত্তিতে গণভোট আয়োজন করতে হবে।
৩. গণভোটে ঐকমত্যপূর্ণ ও ভিন্নমতপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা প্রশ্নে তোলা হবে।
৪. গণভোটে অনুমোদন পেলে ত্রয়োদশ সংসদ সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষমতা পাবে।
৫. সংসদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদের সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা সরকারের।” এতদিন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিল, কিন্তু এখন দলগুলো সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছে।

কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. আইয়ুব মিয়া আলোচনায় অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও।

কমিশনের বৃহস্পতিবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরিত হবে। অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে বসাতে পেরেছে—এটাই বড় অর্জন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদ্যোগ বিরল।”

তিনি মনে করেন, “১৯৯১ সালের মতো সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এবারও অনুসরণ করা যেতে পারে। তখনও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল, অথচ সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হয়েছিল। এবারও গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।”

অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন বিষয়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি হয়। পরে ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই ধাপে আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে।

মোট ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে গণভোটের সময় ও প্রশ্ন নির্ধারণে ভিন্নমত থেকেই এখন সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, “বল এখন সরকারের কোর্টে”—অর্থাৎ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: সিদ্ধান্ত এখন সরকারের হাতে

সর্বশেষ আপডেট ১১:০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়ায় বিষয়টি এখন সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সমন্বয় করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

গত বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পঞ্চম ও শেষ দফার আলোচনায়ও গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে কমিশন আগামী ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে।

বৈঠকে ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এর মধ্যে বিএনপি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করা সময় ও অর্থের অপচয় হবে। নির্বাচনের দিনই আলাদা ব্যালটে গণভোট নেওয়া যেতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদে সব দলের ভিন্নমত স্পষ্টভাবে থাকতে হবে, যাতে নির্বাচনের পর বিজয়ী দল চাইলে তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারে।”

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়াই উত্তম। একই দিনে ভোট হলে বিভ্রান্তি ও জটিলতা তৈরি হবে।” জামায়াতের প্রতিনিধি শিশির মনিরের প্রস্তাব, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ সংবিধান আদেশ জারি করতে হবে, যার তপশিলে সনদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে গণভোট অবশ্যই নির্বাচনের আগে হতে হবে। একই দিনে হলে গণভোটের গুরুত্ব হারাবে।”

আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করে কমিশন সরকারকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিষয়ে পরামর্শ দেবে। দলগুলোর বেশিরভাগই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একমত হলেও গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে বিভক্ত।”

তিনি জানান, বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি অভিন্ন মত দিয়েছেন—
১. জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বিশেষ আদেশ জারি করতে হবে।
২. এই আদেশের ভিত্তিতে গণভোট আয়োজন করতে হবে।
৩. গণভোটে ঐকমত্যপূর্ণ ও ভিন্নমতপূর্ণ বিষয়গুলো আলাদা প্রশ্নে তোলা হবে।
৪. গণভোটে অনুমোদন পেলে ত্রয়োদশ সংসদ সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষমতা পাবে।
৫. সংসদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদের সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা সরকারের।” এতদিন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিল, কিন্তু এখন দলগুলো সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছে।

কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. আইয়ুব মিয়া আলোচনায় অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও।

কমিশনের বৃহস্পতিবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরিত হবে। অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও কমিশনের সভাপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে একসঙ্গে বসাতে পেরেছে—এটাই বড় অর্জন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদ্যোগ বিরল।”

তিনি মনে করেন, “১৯৯১ সালের মতো সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এবারও অনুসরণ করা যেতে পারে। তখনও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল, অথচ সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হয়েছিল। এবারও গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।”

অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন বিষয়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া তৈরি হয়। পরে ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই ধাপে আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে।

মোট ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে গণভোটের সময় ও প্রশ্ন নির্ধারণে ভিন্নমত থেকেই এখন সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, “বল এখন সরকারের কোর্টে”—অর্থাৎ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ।