ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো অনির্ধারিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:৪০:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  • / 114

জুলাই জাতীয় সনদ

বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও কয়েকটি দলের অনুপস্থিতির মধ্যেই সই হলো বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল ও জোট সনদে স্বাক্ষর করে। তবে কীভাবে সনদ বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হওয়ায় এনসিপি সই করেনি। যদিও জামায়াত শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করেছে, দলটি জানিয়েছে— বাস্তবায়নে দেরি হলে তা হবে “জাতির সঙ্গে গাদ্দারি”। এনসিপিসহ ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া আরও পাঁচটি দল সনদে সই করেনি। অন্যদিকে বিএনপি জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশের সূচনা করলাম। এখন আমাদের দায়িত্ব এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা।”

দুপুরে জুলাইযোদ্ধাদের আইনগত দায়মুক্তি ও স্বীকৃতির দাবিতে সংসদ গেটে বিক্ষোভের পর সনদের অঙ্গীকারনামায় সংশোধন আনা হয়। সেখানে তাদের দায়মুক্তি ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকার যুক্ত করা হয়। মোট সাত দফা অঙ্গীকারে সই করেন দলগুলোর প্রতিনিধি ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা।

বিএনপির পক্ষ থেকে সই করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। জামায়াতের পক্ষে সই করেন নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় সনদ স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা। বৃষ্টির মধ্যেও নেতারা মঞ্চে উঠে সই করেন। উপস্থিত ছিলেন শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান ও শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান।

জুলাই সনদে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ৮৪টি সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত আছে। এর মধ্যে ৯টি বিষয়ে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। দলটির দাবি, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হবে আগামী সংসদে গণভোটের পর। জামায়াতের দাবি— নির্বাচনের আগে গণভোটে অনুমোদিত সনদ সংবিধান আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে।

এনসিপির অবস্থান আরও কঠোর— তাদের মতে, পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংস্কারের গাঠনিক ক্ষমতা থাকতে হবে; না হলে সনদ স্বাক্ষর প্রতারণা বলে গণ্য হবে। সনদ স্বাক্ষরের পর রাতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঐকমত্য কমিশনের সদস্য মনির হায়দারের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সনদের এক সংশোধিত সংস্করণে বলা হয়েছিল, কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকলে তা নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং নির্বাচনে জিতে গেলে দলটি তার মতে সংস্কার করার অধিকার পাবে। পরে কমিশন এই অনুচ্ছেদটি বাদ দেয়। বিএনপি আগে থেকেই এ দাবি জানিয়ে আসছে।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য মনির হায়দার জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকারকে বাস্তবায়ন পদ্ধতির সুপারিশ দেওয়া হবে। সেখানে একাধিক বিকল্প থাকবে— সংবিধান আদেশ, গণভোট বা সংসদীয় অনুমোদনের মতো। যারা এখনো সই করেনি, তারাও পরবর্তী সময়ে যোগ দিতে পারবে।

সনদের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার কারণে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ সই করেনি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়ার প্রস্তাব থাকায় গণফোরামও স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে, যদিও পরে কমিশন জানায় এটি ছাপার ভুল।

ড. ইউনূস বলেন, “পরিবর্তনের জন্য যারা জীবন দিয়েছে, তারাই নতুন বাংলাদেশ গড়বে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা ঐক্যের সুর নিয়েই যাব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা এক বর্বর সময় থেকে সভ্যতার পথে এসেছি। এবার আইনের শাসন ও ন্যায়ের পথে এগোতে হবে।”

ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “বহু মতের স্রোত যেন এক মোহনায় মেলে— এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “সংস্কার কমিশনের আট মাসের পরিশ্রমের ফসল এই সনদ। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।”
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ভারসাম্য ও শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।”

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, “বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আস্থা রেখেই আমরা সনদে সই করেছি— আশা করি তিনি কথা রাখবেন।”

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো অনির্ধারিত

সর্বশেষ আপডেট ১০:৪০:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও কয়েকটি দলের অনুপস্থিতির মধ্যেই সই হলো বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল ও জোট সনদে স্বাক্ষর করে। তবে কীভাবে সনদ বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হওয়ায় এনসিপি সই করেনি। যদিও জামায়াত শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করেছে, দলটি জানিয়েছে— বাস্তবায়নে দেরি হলে তা হবে “জাতির সঙ্গে গাদ্দারি”। এনসিপিসহ ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া আরও পাঁচটি দল সনদে সই করেনি। অন্যদিকে বিএনপি জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশের সূচনা করলাম। এখন আমাদের দায়িত্ব এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা।”

দুপুরে জুলাইযোদ্ধাদের আইনগত দায়মুক্তি ও স্বীকৃতির দাবিতে সংসদ গেটে বিক্ষোভের পর সনদের অঙ্গীকারনামায় সংশোধন আনা হয়। সেখানে তাদের দায়মুক্তি ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকার যুক্ত করা হয়। মোট সাত দফা অঙ্গীকারে সই করেন দলগুলোর প্রতিনিধি ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা।

বিএনপির পক্ষ থেকে সই করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। জামায়াতের পক্ষে সই করেন নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় সনদ স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা। বৃষ্টির মধ্যেও নেতারা মঞ্চে উঠে সই করেন। উপস্থিত ছিলেন শহীদ মীর মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান ও শহীদ তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান।

জুলাই সনদে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ৮৪টি সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত আছে। এর মধ্যে ৯টি বিষয়ে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। দলটির দাবি, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হবে আগামী সংসদে গণভোটের পর। জামায়াতের দাবি— নির্বাচনের আগে গণভোটে অনুমোদিত সনদ সংবিধান আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে।

এনসিপির অবস্থান আরও কঠোর— তাদের মতে, পরবর্তী সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংস্কারের গাঠনিক ক্ষমতা থাকতে হবে; না হলে সনদ স্বাক্ষর প্রতারণা বলে গণ্য হবে। সনদ স্বাক্ষরের পর রাতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঐকমত্য কমিশনের সদস্য মনির হায়দারের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সনদের এক সংশোধিত সংস্করণে বলা হয়েছিল, কোনো দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকলে তা নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং নির্বাচনে জিতে গেলে দলটি তার মতে সংস্কার করার অধিকার পাবে। পরে কমিশন এই অনুচ্ছেদটি বাদ দেয়। বিএনপি আগে থেকেই এ দাবি জানিয়ে আসছে।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য মনির হায়দার জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকারকে বাস্তবায়ন পদ্ধতির সুপারিশ দেওয়া হবে। সেখানে একাধিক বিকল্প থাকবে— সংবিধান আদেশ, গণভোট বা সংসদীয় অনুমোদনের মতো। যারা এখনো সই করেনি, তারাও পরবর্তী সময়ে যোগ দিতে পারবে।

সনদের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার কারণে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ সই করেনি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়ার প্রস্তাব থাকায় গণফোরামও স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে, যদিও পরে কমিশন জানায় এটি ছাপার ভুল।

ড. ইউনূস বলেন, “পরিবর্তনের জন্য যারা জীবন দিয়েছে, তারাই নতুন বাংলাদেশ গড়বে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমরা ঐক্যের সুর নিয়েই যাব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা এক বর্বর সময় থেকে সভ্যতার পথে এসেছি। এবার আইনের শাসন ও ন্যায়ের পথে এগোতে হবে।”

ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “বহু মতের স্রোত যেন এক মোহনায় মেলে— এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “সংস্কার কমিশনের আট মাসের পরিশ্রমের ফসল এই সনদ। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।”
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ভারসাম্য ও শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।”

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, “বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আস্থা রেখেই আমরা সনদে সই করেছি— আশা করি তিনি কথা রাখবেন।”