জারজ ইয়াজিদ মুয়াবিয়ার ঘৃণিত যত কাজ
- সর্বশেষ আপডেট ০১:২৬:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫
- / 311
ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও ঘৃণিত শাসকদের একজন হিসেবে চিহ্নিত। তিনি ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের দ্বিতীয় খলিফা, যিনি তার পিতা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের মৃত্যুর পর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে (৬১ হিজরি) ক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনকাল মাত্র তিন বছর হলেও এই স্বল্প সময়েই তিনি মুসলিম জগতে অবর্ণনীয় নির্মমতা, ন্যায়ের বিপর্যয় এবং নৈতিকতা ধ্বংসের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ইয়াজিদের জন্ম ঘিরে রয়েছে নানান বিতর্ক। ঐতিহাসিকদের অনেকে তাকে জারজ অর্থাৎ অবৈধ সন্তান হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই দাবির পেছনে উল্লেখযোগ্য ভিত্তি হচ্ছে তার মাতা “মাইসুন” যিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান দাসী এবং পরে মুয়াবিয়া তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেও বহু বর্ণনায় দেখা যায়, মাইসুন সেই সম্পর্ক কখনো মেনে নেননি। অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, ইয়াজিদের জন্মের সময় মাইসুন অন্য এক খ্রিস্টান দাসীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন, যা তাকে মুসলিম সমাজে জারজ বলে কুখ্যাত করে তোলে।
শুধু জন্ম নয়, চরিত্রের দিক থেকেও ইয়াজিদ ছিলেন ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামী ইতিহাসবিদ ইবনে কাসীর, তাবারী, মাসউদিসহ অনেকেই তার চরিত্রের বর্ণনায় বলেন, ইয়াজিদ ছিল নেশাগ্রস্ত, জুয়াড়ি, কুকুর ও বাঁদর পোষা এবং গান-বাজনা ও মদ্যপানে অভ্যস্ত এক ব্যক্তি। ইসলামী আদর্শ ও সুন্নাহর সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না।
ইয়াজিদের শাসনামলের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও কলঙ্কিত অধ্যায় হলো কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের শাহাদাত। ইমাম হোসাইন ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় নাতি, হজরত আলী ও ফাতিমা (রা.)-এর পুত্র। তিনি ইয়াজিদের ফাসিক চরিত্র ও জুলুমতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর ফলেই ১০ মহররম, ৬১ হিজরিতে, ইয়াজিদের নির্দেশে সেনাপতি উমর ইবনে সাদ ও শিমর ইবনে জৌশনের নেতৃত্বে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ওপর হামলা চালানো হয়।
এই যুদ্ধে শিশু আলী আসগর থেকে শুরু করে ৭২ জন আহলে বাইতের সদস্যকে হত্যা করা হয়। হোসাইন (রা.)-কে নির্মমভাবে হত্যা করে তার পবিত্র শরীর থেকে মাথা আলাদা করে কুফার রাজপথে ঘোরানো হয়। নারী ও শিশুদের বন্দি করে দামেশকে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। ইসলামের ইতিহাসে এত নির্মম, হৃদয়বিদারক ও মানবতা-বিরোধী ঘটনার আর কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
কারবালার হত্যাযজ্ঞের পর ইয়াজিদের বাহিনী মদিনায় হামলা চালায় (ঘটনাটি ‘হাররার বিপর্যয়’ নামে পরিচিত)। সেখানে ইয়াজিদের সেনাবাহিনী তিন দিন ধরে লুটপাট, হত্যাকাণ্ড, নারী ধর্ষণ চালায়। অনেক হাদিসবিদ লিখেছেন, মদিনার নারীদের ধর্ষণের ফলে অসংখ্য জারজ সন্তান জন্ম নিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে মক্কায় বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে ইয়াজিদের বাহিনী কাবা শরিফে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং গম্বুজ ধ্বংস করে। ইসলামের পবিত্রতম স্থানকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এ ঘটনাও ইয়াজিদকে চূড়ান্তভাবে ইসলামের দুশমন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিভিন্ন মাযহাব ও দলমতের মধ্যে ইয়াজিদকে নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের বিশাল অংশ এবং আহলে বায়তের অনুসারীরা তাকে ঘৃণা করে এবং ‘লানতুল্লাহি আলাইহি’ (আল্লাহর অভিশাপ) বলেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম গাজ্জালি, ইমাম ইবনে জাওযি প্রমুখ তাকে অভিশপ্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শিয়া মতবাদের দৃষ্টিতে ইয়াজিদ হচ্ছে প্রকৃত ইসলামের শত্রু ও রাসুলুল্লাহর পরিবারবর্গের হত্যাকারী।
ইয়াজিদের নির্মমতা, চরিত্রহীনতা ও জারজ পরিচয় ইসলাম ও ইতিহাসে এক ঘৃণার প্রতীক। তিনি ক্ষমতায় এসে ইসলামের খোলসধারী এক রাজতন্ত্র কায়েম করেন এবং ইসলামী মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেন। কারবালার ভূমিতে তার বর্বরতার স্মৃতি আজও মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে তাজা রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে। তার মতো শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শিক্ষার মূল বার্তা।






































