ঢাকা ১০:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাতীয় বেতন স্কেলে এলেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫৭:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 74

বায়তুল মুকাররম বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ

দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য নিরসনে দেশের মসজিদগুলোর ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন এই নীতিমালায় গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর পাশাপাশি আচরণবিধি, ছুটি, আবাসন ও কল্যাণ সুবিধার দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সারাদেশের মসজিদগুলোর জনবল কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করতে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দীক।

জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আলেম সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিল। নতুন নীতিমালাকে সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় খতিব পরিষদের সভাপতি মুফতি মাওলানা শামীম মজুমদার বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিতের পথে এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। বাস্তবায়ন হলে মাঠপর্যায়ে বৈষম্য অনেকটাই কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গেজেট অনুযায়ী, মসজিদের পদভিত্তিক গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সিনিয়র পেশ ইমামকে ৫ম গ্রেড, পেশ ইমামকে ৬ষ্ঠ গ্রেড এবং ইমামকে ৯ম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রধান মুয়াজ্জিন থাকবেন ১০ম গ্রেডে এবং সাধারণ মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেডে। খাদেমদের ক্ষেত্রে প্রধান খাদেম ১৫তম ও সাধারণ খাদেম ১৬তম গ্রেড পাবেন। নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ২০তম গ্রেড। তবে খতিবদের বেতন নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী।

নীতিমালায় মসজিদের জনবলের জন্য কিছু আচরণবিধিও যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনীতিমুক্ত থাকা, মুসল্লি ও এলাকাবাসীর নৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে গেজেটে উল্লেখ আছে।

বেতন কে দেবে, তা নিয়েও নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও মডেল মসজিদে কর্মরত ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সরাসরি সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই স্কেলে বেতন পাবেন। অন্যদিকে, স্থানীয় কমিটি পরিচালিত মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব মসজিদে বেতন প্রদানের দায়িত্ব থাকবে স্থানীয় কমিটির ওপর, যদিও সরকার কাঠামোটি অনুসরণে উৎসাহ দেবে।

নীতিমালায় কর্মরতদের কল্যাণের বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী আবাসনের ব্যবস্থা, মাসিক সঞ্চয় চালু করা এবং চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছুটির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে মাসে সর্বোচ্চ চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি, বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনে একদিন অর্জিত ছুটির সুযোগ থাকবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে সাত সদস্যের বাছাই কমিটির বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। চাকরি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এই নীতিমালা প্রণয়নে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি কাজ করেছে। চূড়ান্ত করার আগে আলেম-ওলামা ও ইমাম-খতিবদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

নতুন নীতিমালা জারির মাধ্যমে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালাটি বাতিল করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এর ফলে দেশের মসজিদ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা আরও সুসংহত হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জাতীয় বেতন স্কেলে এলেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা

সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫৭:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য নিরসনে দেশের মসজিদগুলোর ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন এই নীতিমালায় গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর পাশাপাশি আচরণবিধি, ছুটি, আবাসন ও কল্যাণ সুবিধার দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

সারাদেশের মসজিদগুলোর জনবল কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করতে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দীক।

জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আলেম সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছিল। নতুন নীতিমালাকে সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় খতিব পরিষদের সভাপতি মুফতি মাওলানা শামীম মজুমদার বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিতের পথে এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। বাস্তবায়ন হলে মাঠপর্যায়ে বৈষম্য অনেকটাই কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গেজেট অনুযায়ী, মসজিদের পদভিত্তিক গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সিনিয়র পেশ ইমামকে ৫ম গ্রেড, পেশ ইমামকে ৬ষ্ঠ গ্রেড এবং ইমামকে ৯ম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রধান মুয়াজ্জিন থাকবেন ১০ম গ্রেডে এবং সাধারণ মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেডে। খাদেমদের ক্ষেত্রে প্রধান খাদেম ১৫তম ও সাধারণ খাদেম ১৬তম গ্রেড পাবেন। নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ২০তম গ্রেড। তবে খতিবদের বেতন নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী।

নীতিমালায় মসজিদের জনবলের জন্য কিছু আচরণবিধিও যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনীতিমুক্ত থাকা, মুসল্লি ও এলাকাবাসীর নৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে গেজেটে উল্লেখ আছে।

বেতন কে দেবে, তা নিয়েও নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি ও মডেল মসজিদে কর্মরত ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সরাসরি সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই স্কেলে বেতন পাবেন। অন্যদিকে, স্থানীয় কমিটি পরিচালিত মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব মসজিদে বেতন প্রদানের দায়িত্ব থাকবে স্থানীয় কমিটির ওপর, যদিও সরকার কাঠামোটি অনুসরণে উৎসাহ দেবে।

নীতিমালায় কর্মরতদের কল্যাণের বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী আবাসনের ব্যবস্থা, মাসিক সঞ্চয় চালু করা এবং চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছুটির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে মাসে সর্বোচ্চ চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি, বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনে একদিন অর্জিত ছুটির সুযোগ থাকবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে সাত সদস্যের বাছাই কমিটির বিধান রাখা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। চাকরি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এই নীতিমালা প্রণয়নে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি কাজ করেছে। চূড়ান্ত করার আগে আলেম-ওলামা ও ইমাম-খতিবদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

নতুন নীতিমালা জারির মাধ্যমে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালাটি বাতিল করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, এর ফলে দেশের মসজিদ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা আরও সুসংহত হবে।