‘জনতার মঞ্চ’ যেভাবে বিএনপি সরকারের পতন ঘটায়
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৬:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ জুন ২০২৫
- / 312
১৯৯৬ সাল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্থির ও মোড় ঘোরানো বছর। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এই রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির কেন্দ্রে ছিল একটি নাম—‘জনতার মঞ্চ’।
১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬; বিএনপি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল বিরোধিতা ও অনাস্থা। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। নির্বাচন হয়েছিল কার্যত একদলীয়ভাবে। অংশ নেয়নি দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
এই নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মনেও ছিল অসন্তোষ। ভুয়া ভোট, টার্নআউটের অসঙ্গতি ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। মাত্র ২১ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে গঠিত হয় সংসদ। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও উত্তপ্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনগণ তখন নির্লিপ্ত নয়, বরং ক্ষুব্ধ। তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করেছিল। কিন্তু সেটি হয়নি।
এই পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটে এক অনন্য গণআন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘জনতার মঞ্চ’-এর। এটি ছিল মূলত একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি এবং ছাত্র সমাজের একটি যৌথ উদ্যোগ।
মঞ্চের আহ্বায়ক ছিলেন লেখক ও বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির ও আহমদ রফিক। শুরু হয় টানা আন্দোলন, যেখানে দেশের ছাত্র, যুবক, নারী, শিক্ষক, পেশাজীবী সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়।
ঢাকার শাহবাগ মোড়ে প্রতিদিন জমে উঠত মিছিল, প্রতিবাদ, আলোচনা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঞ্চ হয়ে ওঠে সরকারের বিরোধিতার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে রাজপথে রাজনীতির উত্তাপ, অন্যদিকে সংস্কৃতি ও গণচেতনার পুনর্জাগরণ—এই দ্বিমুখী আন্দোলনই ছিল জনতার মঞ্চের বৈশিষ্ট্য।
জনতার মঞ্চ দাবি তোলে—অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে এবং সেই সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে। এ দাবিতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ঢাকার বাইরেও গঠিত হয় আঞ্চলিক জনতার মঞ্চ।
সরকার প্রথমে জনতার মঞ্চকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আন্দোলন দিনে দিনে ব্যাপকতা পেতে থাকে। হরতাল, অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচির কারণে দেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সংঘর্ষে প্রাণ হারান অনেকে।
এদিকে রাষ্ট্রের ভেতরেও দেখা দেয় ফাটল। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে অস্বস্তির খবর আসতে থাকে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে সেনাবাহিনী জানিয়ে দেয়—রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন।
এক পর্যায়ে এসে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়েও এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের ২৪ জন সচিব একসঙ্গে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বলা হয়, সাবেক সচিব ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীর তাঁদের সংঘটিত করেন। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাও করা হয়।
চর্তুমুখী এই চাপের এক পর্যায়ে বিএনপি সরকার কোনঠাসা হয়ে পড়ে। খালেদা জিয়া প্রথমে প্রতিরোধের ভান করলেও, শেষ পর্যন্ত জনগণের চাপের কাছে মাথানত করতে বাধ্য হন।
৩০ মার্চ, ১৯৯৬, মাত্র ৪৫ দিন বয়সী ছদ্ম গণতন্ত্রের সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। গঠন করা হয় একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্দোলনের বিজয় আসে। ১২ জুন, ১৯৯৬ অবশেষে দেশের মানুষ পায় একটি বহুদলীয়, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় ফিরে আসে।
১৯৯৬ সালের এই রাজনৈতিক রূপান্তর ছিল জনগণের সংগঠিত শক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। জনতার মঞ্চ হয়ে উঠেছিল কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর































