রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন উত্তাপ
ছাত্রদল কেন ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলছে?
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৫৮:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
- / 215
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে পুরনো দুই মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সম্প্রতি তৈরি হওয়া দূরত্বের জের পড়ছে তাদের ছাত্রসংগঠন—ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওপর। বিশেষ করে ‘শিবির’কে ‘গুপ্ত সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রদলের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ছাত্রদলের অভিযোগ—শিবির ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ছদ্মবেশে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ‘মব’ তৈরি করছে এবং তারেক রহমানসহ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ‘প্রোপাগান্ডা’ চালাচ্ছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, শিবির পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়াচ্ছে এবং ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করছে।
তিনি দাবি করেন, “৫ আগস্টের পর পরিকল্পিতভাবে বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে শিবির। এখন তারা প্রকাশ্যে না থেকে ছায়া রাজনীতি করতে চায়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চায় না।”
অন্যদিকে ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে ‘অপপ্রচার’ বলা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে ছাত্রদল আমাদের ওপর দোষ চাপাতে চাইছে। পাবলিক ইস্যুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মাঠে নামলেই তারা তা শিবির বলে চালিয়ে দিতে চায়।”
রাজনৈতিক উত্তাপের উৎস কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের সূচনা গত বছরের ৫ আগস্টের সরকার পতনের পরবর্তী সময় থেকে। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কার ভূমিকা বেশি’—এ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে চাপা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর থেকেই দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা বাড়তে থাকে।
বিশেষ করে ঢাবিতে ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলনের একটি ভিডিও যেখানে বলা হয়, “শিবিরের ওপর দায় দিয়ে দাও”—তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।
এছাড়া ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাবির হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এই আন্দোলনকে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে—তা নিয়ে চলতে থাকে পাল্টাপাল্টি দাবি।
ছাত্রদলের মতে, শিবির ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কমিটি না দিয়ে ছদ্মবেশে ছাত্র রাজনীতি করছে, তাই তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। নাছির উদ্দিন বলেন, “যাদের আমরা চিনি না, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় না, তারা ক্যাম্পাসে কীভাবে রাজনীতি করে?”
উল্টো শিবির বলছে, এটি রাজনৈতিকভাবে একটি নির্দিষ্ট বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা। শিবির সভাপতি বলেন, “আমরা যেখানে আছি, সেখানে পরিচয় দিয়েই আছি। আমাদের গোপন করার কিছু নেই।”
অতীতের মিত্রতা, বর্তমানের বিভাজন
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত একত্রে সরকার গঠন করে। তার আগেই ছাত্রদল-ছাত্রশিবির যৌথভাবে গঠন করে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এই দুই ছাত্রসংগঠনই ছিল নেতৃত্বে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ পাল্টেছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, জামায়াত এখন ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পথচলার সঙ্গী নয়’। এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল বলেন, “জামায়াত চায় না দেশে স্থিতিশীলতা আসুক।”
তবে জামায়াত ও শিবিরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই বিরোধ সাময়িক। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও শিবিরের সাবেক সভাপতি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “রাজনীতিতে এমন বিভেদ নতুন কিছু নয়। সময়ই বলে দেবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে।”
প্রতীকী রাজনীতি বনাম বাস্তব দ্বন্দ্ব
ঢাবিতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেখা যায়, ছাত্রদল শিবিরকে ‘অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারী’ মনে করছে। ১৪ জুলাই নয়াপল্টনে ছাত্রদলের এক সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতারা শিবিরকে সরাসরি ‘গুপ্ত সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন।
ছাত্রদলের অভিযোগ, শিবির তাদের ক্যাম্পাসে হেয় প্রতিপন্ন করতে নানা কৌশলে কাজ করছে। আবার শিবির বলছে, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক শিকার—বিষয়টিকে বড় করে তুলে ছাত্রদল মূলত শিবিরের উত্থান ঠেকাতে চাইছে।
অর্থের উৎস ও গোপন প্রভাব
সংগঠন দুটি অর্থবিষয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে। তবে কেউই তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেনি। পুরান ঢাকায় এক ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরেও দুই সংগঠনের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ ঘটনার সঙ্গে কেউ সরাসরি জড়িত ছিল কিনা—তা নিয়ে তদন্ত চললেও পারস্পরিক দোষারোপ থেমে থাকেনি।
যদিও অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে একসাথে রাজনীতি করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির, বর্তমানে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধিতায় নেমেছে। আদর্শগত পার্থক্য, নেতৃত্বের সংকট এবং গণআন্দোলনে শ্রেয়তা কে পাবে—এই দ্বন্দ্বই মূলত দুই সংগঠনের সম্পর্ককে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা’ থেকে সরিয়ে এনেছে ‘ঘোষিত বিরোধে’।
তবে এই বিরোধ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এর প্রভাব বিএনপি-জামায়াতের মূল রাজনীতিতে কতটা পড়বে—তা সময়ই বলবে।




































