ঢাকা ০৬:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৮:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 76

চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক বৈঠকে সংস্থাটি সুদের হারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছে তারা। এছাড়া রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) গঠনে রিজার্ভের ব্যবহার এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি সফল না হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমায় তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৩৬ শতাংশে। তবে আইএমএফের মতে, এই ধারা ধরে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি।

তারা একই সঙ্গে জানতে চায়, দীর্ঘ সময় এ নীতি অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগে যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা কী। বৈঠকে সংস্থাটি সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতি, মুদ্রানীতির কাঠামো এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।

আইএমএফ দেশের ব্যাংক খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। চুক্তি অনুযায়ী সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সরকারের পরিবর্তনের পর প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ হলে তা নিয়ে সংস্থাটি ইতিবাচক মন্তব্য করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা—যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় চার লাখ কোটি টাকা বেড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির হারও ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যদিও লক্ষ্য ছিল ৫ শতাংশের নিচে রাখা।

বৈঠকে রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে আইএমএফ। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের “লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসোর্ট” নীতির আওতায় জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা প্রদানের বিষয়েও আপত্তি জানায়। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে, যাদের কাছে প্রয়োজনীয় বন্ড বা বিল ছিল না। এসব ব্যাংক শুধু “প্রমিজরি নোট” জমা দিয়ে টাকা নিয়েছে, এবং এখনো কেউ অর্থ ফেরত দেয়নি। আইএমএফ জানায়, এ ধরনের ইনসিকিউর্ড লেন্ডিং বন্ধ করতে হবে, কারণ এটি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ ২০.৫ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ বিলিয়ন ও ডিসেম্বরের লক্ষ্য ১৯.৯ বিলিয়নের চেয়ে বেশি। তবে রাজস্ব ঘাটতি ও কম কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে তারা অসন্তুষ্টি জানায়।

বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন সংস্থার গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকস প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. এজাজুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আইএমএফের পঞ্চম রিভিউ মিশনের অংশ হিসেবে তারা মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, তারল্য সহায়তা, রিজার্ভ ব্যবহার ও খেলাপি ঋণ কমাতে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে।”

২০২২ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪৭০ কোটি ডলারের আইএমএফ ঋণ চুক্তি করে, যা পরে বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তি, যা ডিসেম্বর মাসে ছাড় হওয়ার কথা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইএমএফ নিশ্চিত হতে চায়—সংস্কার কার্যক্রমগুলো নির্বাচনের পরেও চলবে কি না। তাই ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

চলমান মিশন ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৮:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক বৈঠকে সংস্থাটি সুদের হারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছে তারা। এছাড়া রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) গঠনে রিজার্ভের ব্যবহার এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি সফল না হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমায় তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৩৬ শতাংশে। তবে আইএমএফের মতে, এই ধারা ধরে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি।

তারা একই সঙ্গে জানতে চায়, দীর্ঘ সময় এ নীতি অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগে যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা কী। বৈঠকে সংস্থাটি সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতি, মুদ্রানীতির কাঠামো এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে।

আইএমএফ দেশের ব্যাংক খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। চুক্তি অনুযায়ী সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সরকারের পরিবর্তনের পর প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ হলে তা নিয়ে সংস্থাটি ইতিবাচক মন্তব্য করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা—যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় চার লাখ কোটি টাকা বেড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির হারও ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যদিও লক্ষ্য ছিল ৫ শতাংশের নিচে রাখা।

বৈঠকে রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে আইএমএফ। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের “লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসোর্ট” নীতির আওতায় জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা প্রদানের বিষয়েও আপত্তি জানায়। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে, যাদের কাছে প্রয়োজনীয় বন্ড বা বিল ছিল না। এসব ব্যাংক শুধু “প্রমিজরি নোট” জমা দিয়ে টাকা নিয়েছে, এবং এখনো কেউ অর্থ ফেরত দেয়নি। আইএমএফ জানায়, এ ধরনের ইনসিকিউর্ড লেন্ডিং বন্ধ করতে হবে, কারণ এটি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ ২০.৫ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বরের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ বিলিয়ন ও ডিসেম্বরের লক্ষ্য ১৯.৯ বিলিয়নের চেয়ে বেশি। তবে রাজস্ব ঘাটতি ও কম কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে তারা অসন্তুষ্টি জানায়।

বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন সংস্থার গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকস প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. এজাজুল ইসলামসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, “আইএমএফের পঞ্চম রিভিউ মিশনের অংশ হিসেবে তারা মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, তারল্য সহায়তা, রিজার্ভ ব্যবহার ও খেলাপি ঋণ কমাতে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে।”

২০২২ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪৭০ কোটি ডলারের আইএমএফ ঋণ চুক্তি করে, যা পরে বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তি, যা ডিসেম্বর মাসে ছাড় হওয়ার কথা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আইএমএফ নিশ্চিত হতে চায়—সংস্কার কার্যক্রমগুলো নির্বাচনের পরেও চলবে কি না। তাই ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিলে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

চলমান মিশন ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে।