ঘটনাস্থল মাগুরা: বিশেষ চিহ্ন ছাড়া পাসপোর্ট মেলে না
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৫:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
- / 92
মাগুরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস; যেখানে দালাল ছাড়া যেন কোন কথাই বলা যায় না। আবেদন থেকে শুরু করে ছবি তোলা, ফিঙ্গার দেয়া কিংবা পাসপোর্ট বিতরন- সব কিছুতেই একটি ‘বিশেষ চিহ্ন’ না থাকলে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া দায়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব মূলে রয়েছে সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন খন্দকার। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি এই কর্মকর্তা এখানে যোগদান করেন। এর আগে মুন্সিগঞ্জ, বরিশাল, রংপুর, ঢাকার যাত্রাবাড়ি- এই কর্মকর্তা যখনই যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই গড়ে তুলেছেন দালালদের আলাদা একটি সিন্ডিকেট।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাগুরায় দলটির নেতা-কর্মীদের মামলার বিষয়গুলো গোঁপন করে তড়িঘড়ি করে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেন কামাল হোসেন। প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরে বিশেষ দূত পাঠিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
এই কর্মকর্তা দায়িত্ব নেয়ার পর সংস্থাটির আনসার সদস্যরা নিজেরাই দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। টাকার বিনিময়ে সেবাপ্রার্থীদের আবেদনপত্রে বিশেষ “চিহ্ন” বসিয়ে করে দিচ্ছেন পাসপোর্ট।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাগুরা পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে অন্তত ডজন খানেক কম্পিউটারের দোকান গড়ে উঠেছে। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি থেকেও অনলাইনে আবেদনের পর প্রিন্ট কপিতে বিশেষ “চিহ্ন” বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট তৈরি হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘টাকা হলে মাগুরায় মুদি দোকান ও ফটোকপির দোকানেও মেলে পাসপোর্ট’। এসব দোকানে আবেদন প্রসেসিং’র কথা বলে সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়ে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা নেয়া হয়।
পাসপোর্ট করতে আসা আবুল হোসেন নামে এক সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ, তিনি বাসা থেকে নিজে নিজে আবেদনপত্র ও পেমেন্টের কাজ করেছেন। কিন্তু যখন কাগজপত্র জমা দিতে এসেছেন, কাউন্টারে ডকুমেন্ট সংকট দেখিয়ে জমা নেয়া হয়নি। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে, তারা বলে দেন সামনের দোকান থেকে যাতে সঠিক নিয়মে আবেদন করি।
নতুন পাসপোর্ট করতে মাগুরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে শ্রীপুর থেকে এসেছেন মাসুদ আলী নামে এক ব্যক্তি। পাসপোর্টের আবেদনপত্র নিজে নিজে পূরণ করে অনলাইনে ফি পরিশোধ করেছেন তিনি। পরবর্তীতে পাসপোর্ট অফিসে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কাউন্টারের সামনে যান তিনিসহ এই প্রতিবেদক। সেখানে দায়িত্বে থাকা পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা প্রায় ১৫ মিনিট মোবাইলে কথা বলা শেষ করে বিভিন্ন কাগজপত্র নেই এমন অযুহাতে তার আবেদনপত্র প্রত্যাখ্যান করে দেন।
তিনি বলেন, আপনার কাগজপত্র ঠিক নেই। ঠিক করে নিয়ে আসেন তখন কাগজ জমা নেব।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশেষ ‘চিহ্ন’ ছাড়া অধিকাংশ পাসপোর্টের আবেদনই ফিরিয়ে দেয়া হয়।
মাগুরা এলাকার প্রতিটি গ্রামেই দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়ির কেউ না কেউ বিদেশে আছেন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয় স্বজনদেরকেও বিদেশে নিতে চাচ্ছেন। ঝামেলা বিহীন পাসপোর্ট করতে গিয়ে তারা ওইসব দালালদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মাগুরা আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা -কর্মচারীরা নিজেদের পকেট ভারী করছেন।
শহরের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা একটা পাসপোর্টের ফরম ফিলাপ, টাকা পেমেন্ট ও সার্ভিস দিয়ে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পাই। অথচ, সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি নিতে হয়। এর মধ্যে পাসপোর্ট অফিসের মার্কা নিতে গুণতে হয় অতিরিক্ত টাকা। অর্থাৎ ৪৮ পৃষ্টার ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের জন্য একজন গ্রাহককে সর্বনিম্ন ৬৮০০ টাকা থেকে ৭০০০ টাকা খরচ করতে হয়। বইয়ের আকার ও মেয়াদে টাকার পরিমাণ বাড়ে।
এই টাকা না দিলে পাসপোর্ট অফিসে সেবাপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন, নানা অজুহাতে আবেদনপত্র ফিরিয়ে দেয়া হয়। আবার, টাকা দিলেই সেবাপ্রার্থীর আবেদনপত্রে বিশেষ চিহ্ন দিয়ে জমা করা হয়। এটি নতুন কিছু না, মাগুরায় এটি এখন ওপেন সিক্রেট।
পাসপোর্ট অফিসের সিটিজেন চার্টারের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি ৪৮ পৃষ্ঠার নিয়মিত পাসপোর্ট করতে ৪ হাজার ২৫ টাকা (বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আবেদনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ) ফি জমা দিতে হবে। এই পাসপোর্ট পেতে ১৫ থেকে ২১ দিন অপেক্ষা করতে হবে। আর জরুরি পাসপোর্ট করতে লাগবে ৬ হাজার ৩২৫ টাকা, আর এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৭ থেকে ১০ দিন। অন্যদিকে ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে অতি জরুরি পাসপোর্ট পেতে চাইলে দিতে হবে ৮ হাজার ৫০ টাকা। এ ছাড়া ৪৮ পৃষ্ঠার এবং ১০ বছর মেয়াদসহ নিয়মিত পাসপোর্ট করতে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা লাগবে। এই পাসপোর্ট পেতে অপেক্ষা করতে হবে ১৫ থেকে ২১ দিন। আর ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে জরুরি পাসপোর্ট পেতে চাইলে ফি দিতে হবে ৮ হাজার ৫০ টাকা। এর বাইরে অতি জরুরি পাসপোর্ট ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে নিতে চাইলে শুধু ফি গুনতে হবে ১০ হাজার ৩৫০ টাকা।
এরপর পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটকে দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য (নেমপ্লেট না থাকায় নাম জানা যায়নি ) আড়াই হাজার টাকায় বিষয়টি সুরাহা করতে পারবেন বলে জানান। অনেক দেন দরবার করে শেষে ২ হাজার টাকায় চুক্তিতে রাজি হন তিনি। এরপর কাউন্টারের ভেতরে গিয়ে নিমিষেই সিল মেরে আবেদনকারী ব্যক্তির ফরমের ই-মেইলের স্থানে বিশেষ মার্কা নিয়ে আসেন তিনি। এরপর অন্য একটি রুমে গিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি দিতে বলেন ওই আনসার সদস্য। পরে তার ইশারায় অন্য এক আনসার সদস্য তাকে (আবেদনকারী) সহোযোগিতা করেন। নির্ভরশীল একটি সূত্র জানায়, আনসার সদস্যরা এই বাড়তি আদায়কৃত অর্থ একা খান না। এর সিংহভাগ অর্থাৎ ৭০% চলে যায়- উপ পরিচালক কামাল হোসেন সরকারের পকেটে।
এ সময় বিশেষ মার্কার জন্য পাসপোর্ট করতে আসা ব্যক্তি দুই হাজার টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তার পথ আটকে দিয়ে পিছু নেন আনসার সদস্যদ্বয়। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে মুহূর্তেই ভোল পাল্টান দুজন। মোবাইলে থাকা প্রমাণ দেখালে চুপসে যান তারা। একপর্যায়ে আকুতি-মিনতি করতে থাকেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ওই আনসার সদস্যরা।
সূত্রের দাবি, “উপ- পরিচালক কামাল হোসেন সরকার এই অর্থে ঢাকার যাত্রা বাড়িতে প্লট কিনেছেন, হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত তার ভাইয়ের কাছে টাকা পাঠান প্রতিমাসে। সেখানে সেকেন্ড হোম গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। শ্বশুর বাড়ির লোকজনের নামেও কিনেছেন বিপুল পরিমান সম্পত্তি। প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি পুরো সপ্তাহের ভাগের বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদপুরের বাড়িতে নিয়ে যান।” সুচতুর এই কর্মকর্তা ব্যাংকে কোন টাকা রাখেন না বলেও শোনা যায়। যাত্রাবাড়ি, বরিশাল, রংপুর ও মুন্সিগঞ্জের পাসপোর্ট অফিসে থাকা কালীন তার বিরুদ্ধে চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করে দেয়ার অভিযোগ আছে।
দেখা যায়, “সিস্টেমে’ গেলে লাইনে দাঁড়াতে হয় না এই পাসপোর্ট অফিসে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাগুরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক কামাল হোসেন সরকার বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, নিয়ম মেনেই তিনি কাজ করছেন। একটা পক্ষ যারা কিনা সুবিধা পায়নি, তারা আমার বিরুদ্ধে নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
কার সেই পক্ষ জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, সুনিদিষ্টভাবে বলা মুশকিল। অনেকেই আছেন, যারা সুবিধা না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার কোন ভাই বিদেশে থাকেন না। তবে আমাদের সূত্র নিশ্চিত করেছেন, তার ছোট ভাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন।
চলবে ..
































