ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গোপালগঞ্জে ‘নৌকার দুর্গ’ ভাঙার চ্যালেঞ্জে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:১৫:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
  • / 315

গোপালগঞ্জে বিএনপি’র মনোনয়ন পাওয়া তিন নেতা।

আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ঘাঁটি গোপালগঞ্জে বিএনপি এবারও প্রতীকী লড়াইয়ে নেমেছে। জেলার তিনটি আসনেই দলটি প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে তৃণমূলে প্রতিক্রিয়া মিশ্র-কোথাও স্বস্তি, কোথাও তীব্র অস্বস্তি ও বিভক্তি।

গোপালগঞ্জ–১ (কাশিয়ানী–মুকসুদপুর) আসনে বিএনপির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের মতে, এই আসনে তাঁকে ঘিরে তৃণমূলে তুলনামূলক সন্তুষ্টি রয়েছে। একজন উপজেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সেলিম ভাই দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয়। সংগঠনের দুর্দিনেও তিনি কর্মীদের পাশে ছিলেন। কেন্দ্র তাঁর প্রতি আস্থা দেখিয়েছে, এটা ইতিবাচক দিক।”

গোপালগঞ্জ–৩ (কোটালীপাড়া–টুঙ্গিপাড়া) আসনে প্রার্থী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী। দলীয় নেতারা মনে করেন, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিপরীতে এই নেতা ভবিষ্যতে বিকল্প নেতৃত্ব গড়তে পারেন।

এক জেলা নেতা বলেন, “জিলানী সাহসী, ও আদর্শবান। তাঁর উপস্থিতি অন্তত তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহী করবে।”

তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে গোপালগঞ্জ–২ (সদর–কাশিয়ানী) আসন নিয়ে। এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. কে এম বাবর আলী। কিন্তু তাঁকে ঘিরে দলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, কারণ তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন। তাছাড়া গত ২২ আগস্ট তাঁর বাসা থেকে যৌথ বাহিনী অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে- ঘটনাটি তাঁকে ঘিরে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।

এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী সরদার মো. নুরুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁকে সাক্ষাৎকারে পর্যন্ত ডাকা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, “এখানে একটা সিন্ডিকেট কাজ করেছে। মাঠে যাঁরা লড়েছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে হঠাৎ এক অচেনা মুখকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”

একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, “বাবর আলীকে নিয়ে তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা নেই। বরং সাবেক সভাপতি এম এইচ খান মঞ্জু, আহ্বায়ক শরিফ রফিকুজ্জামান ও সরদার নুরুজ্জামানের মতো নেতাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে সংগঠনে হতাশা ছড়িয়েছে।”

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি এম এইচ খান মঞ্জু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান, তাহলে বিএনপির ভোট আরও বিভক্ত হবে। সূত্র জানায়, মঞ্জু ও তাঁর অনুসারীরা ইতিমধ্যেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছেন।

জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, “গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুর্গ, এটা সবাই জানে। কিন্তু বিএনপি যদি এখানে ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। শুধু নাম ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠে কর্মীদের একত্র করা দরকার।”

গোপালগঞ্জের তৃণমূল নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিএনপির কার্যক্রম সীমিত। মামলা–হামলা ও দমননীতির কারণে অনেক কর্মী এলাকা ছেড়ে গেছেন। এক উপজেলা নেতা বলেন, “আমরা জানি, জয় নয়, উপস্থিতিই এখন লক্ষ্য। কিন্তু এই উপস্থিতি ধরে রাখাও সহজ নয়।”

জেলা বিএনপির আরেক সূত্র বলেন, “দল এবার অন্তত তিনটি আসনেই প্রার্থী দিতে পেরেছে- এটাই অনেক। আগে অনেকে ভয় পেতেন প্রার্থী হতে, এখন সেই ভয় কাটছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গে বিএনপির এই প্রতীকী অংশগ্রহণ দলটির ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার এক পরীক্ষা। তাঁদের ভাষায়, “নৌকার দুর্গ ভাঙা এখন শুধু নির্বাচনের প্রশ্ন নয়, সংগঠনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।”

গোপালগঞ্জের মাঠে তাই এখন দৃশ্যপট একটাই- তিন প্রার্থী, তিন বাস্তবতা, কিন্তু চ্যালেঞ্জ একটাই: ‘দুর্গে টিকে থাকা।’

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

গোপালগঞ্জে ‘নৌকার দুর্গ’ ভাঙার চ্যালেঞ্জে বিএনপি

সর্বশেষ আপডেট ০৫:১৫:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ঘাঁটি গোপালগঞ্জে বিএনপি এবারও প্রতীকী লড়াইয়ে নেমেছে। জেলার তিনটি আসনেই দলটি প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে তৃণমূলে প্রতিক্রিয়া মিশ্র-কোথাও স্বস্তি, কোথাও তীব্র অস্বস্তি ও বিভক্তি।

গোপালগঞ্জ–১ (কাশিয়ানী–মুকসুদপুর) আসনে বিএনপির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেলিমুজ্জামান মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের মতে, এই আসনে তাঁকে ঘিরে তৃণমূলে তুলনামূলক সন্তুষ্টি রয়েছে। একজন উপজেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সেলিম ভাই দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয়। সংগঠনের দুর্দিনেও তিনি কর্মীদের পাশে ছিলেন। কেন্দ্র তাঁর প্রতি আস্থা দেখিয়েছে, এটা ইতিবাচক দিক।”

গোপালগঞ্জ–৩ (কোটালীপাড়া–টুঙ্গিপাড়া) আসনে প্রার্থী হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী। দলীয় নেতারা মনে করেন, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিপরীতে এই নেতা ভবিষ্যতে বিকল্প নেতৃত্ব গড়তে পারেন।

এক জেলা নেতা বলেন, “জিলানী সাহসী, ও আদর্শবান। তাঁর উপস্থিতি অন্তত তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহী করবে।”

তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে গোপালগঞ্জ–২ (সদর–কাশিয়ানী) আসন নিয়ে। এখানে মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. কে এম বাবর আলী। কিন্তু তাঁকে ঘিরে দলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, কারণ তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন। তাছাড়া গত ২২ আগস্ট তাঁর বাসা থেকে যৌথ বাহিনী অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে- ঘটনাটি তাঁকে ঘিরে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।

এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী সরদার মো. নুরুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁকে সাক্ষাৎকারে পর্যন্ত ডাকা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, “এখানে একটা সিন্ডিকেট কাজ করেছে। মাঠে যাঁরা লড়েছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে হঠাৎ এক অচেনা মুখকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”

একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, “বাবর আলীকে নিয়ে তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা নেই। বরং সাবেক সভাপতি এম এইচ খান মঞ্জু, আহ্বায়ক শরিফ রফিকুজ্জামান ও সরদার নুরুজ্জামানের মতো নেতাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে সংগঠনে হতাশা ছড়িয়েছে।”

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি এম এইচ খান মঞ্জু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান, তাহলে বিএনপির ভোট আরও বিভক্ত হবে। সূত্র জানায়, মঞ্জু ও তাঁর অনুসারীরা ইতিমধ্যেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছেন।

জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, “গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের দুর্গ, এটা সবাই জানে। কিন্তু বিএনপি যদি এখানে ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। শুধু নাম ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠে কর্মীদের একত্র করা দরকার।”

গোপালগঞ্জের তৃণমূল নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিএনপির কার্যক্রম সীমিত। মামলা–হামলা ও দমননীতির কারণে অনেক কর্মী এলাকা ছেড়ে গেছেন। এক উপজেলা নেতা বলেন, “আমরা জানি, জয় নয়, উপস্থিতিই এখন লক্ষ্য। কিন্তু এই উপস্থিতি ধরে রাখাও সহজ নয়।”

জেলা বিএনপির আরেক সূত্র বলেন, “দল এবার অন্তত তিনটি আসনেই প্রার্থী দিতে পেরেছে- এটাই অনেক। আগে অনেকে ভয় পেতেন প্রার্থী হতে, এখন সেই ভয় কাটছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গে বিএনপির এই প্রতীকী অংশগ্রহণ দলটির ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার এক পরীক্ষা। তাঁদের ভাষায়, “নৌকার দুর্গ ভাঙা এখন শুধু নির্বাচনের প্রশ্ন নয়, সংগঠনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।”

গোপালগঞ্জের মাঠে তাই এখন দৃশ্যপট একটাই- তিন প্রার্থী, তিন বাস্তবতা, কিন্তু চ্যালেঞ্জ একটাই: ‘দুর্গে টিকে থাকা।’