গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য দূর, কর্মজীবী মায়েদের জন্য বিশেষ কর্মঘণ্টা ও শিল্প এলাকায় বাধ্যতামূলক ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার গাজীপুরে এক নির্বাচনি জনসভায় তিনি বলেন, শ্রমজীবী নারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
আরও পড়তে পারেন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গার্মেন্টস খাতে নারী শ্রমিকদের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে চলমান বেতন বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের অবসান ঘটানো হবে। তিনি বলেন, পুরুষের সমান কাজ করেও নারীরা কম মজুরি পান, বিশেষ করে মায়েরা যথাযথ সম্মান থেকে বঞ্চিত হন। এই বৈষম্য আর চলতে দেওয়া হবে না।
গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়েদের জন্য বিশেষ কর্মঘণ্টার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, অন্তত দুই থেকে আড়াই বছর পর্যন্ত মায়েরা দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা কাজ করবেন। বাকি তিন ঘণ্টা তারা সন্তানকে সময় দেবেন, যা শিশুর অধিকার। এতে তাদের বেতন কমবে না। অতিরিক্ত তিন ঘণ্টার বেতন সরকার ও সমাজসেবা অধিদপ্তর বহন করবে, যা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে শিল্প এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী শ্রমিক থাকলে সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাজীপুরের রাজবাড়ি ময়দানে ১১-দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
গাজীপুরকে অপরিকল্পিত শিল্প এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো জেলা শিল্পাঞ্চলে পরিণত হলেও এখানে পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী এখানে কাজ করলেও তাদের জীবনে নিরাপত্তা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে যদি ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে পরদিন থেকেই গাজীপুরকে একটি পরিকল্পিত শিল্প নগরীতে রূপ দেওয়া হবে।
শ্রমিকদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, অনেক শ্রমিকের সন্তান ভালো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ‘আমরা রাজার ছেলে রাজা’ ধরনের রাজনীতির ধারা বদলে দেওয়া হবে। কোনো শ্রমিকের সন্তান মেধাবী হলে তার দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। শ্রমিক শ্রেণি থেকেই ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী বেরিয়ে আসুক, সেটিই তাদের লক্ষ্য।
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও ছাত্র-জনতা সবাই ন্যায়বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে সবাই নিজ নিজ অধিকার ফিরে পাবে।
নাম উল্লেখ না করে বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটি দল দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা বললেও ৪৯ জন ঋণ খেলাপিকে প্রার্থী করেছে। আগে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করে সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। ঋণ খেলাপিদের সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু মানুষ সময়ের আগেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এখনই হামলা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে। তারা ক্ষমতায় গেলে মানুষ শান্তিতে কাজ বা চাষাবাদ করতে পারবে না। এই অস্থিরতা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট।
বিগত শাসনামলের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৪ বছরে দুই ধরনের উন্নয়ন হয়েছে—একটি জনগণের জন্য, আরেকটি রাজনৈতিক নেতাদের জন্য। জনগণের উন্নয়নের নামে নিম্নমানের কাজ হয়েছে। গত সাড়ে ১৫ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। নেতাদের সম্পদ বহুগুণ বেড়েছে, আত্মীয়দের নামে সম্পদ গড়া হয়েছে। তবে আল্লাহর বিচারে আজ তারা পালাতে গিয়ে ধরা পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, তিনি শুধু জামায়াতে ইসলামীর নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চান। দলীয় বা পারিবারিক শাসন নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য। দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফের প্রতীক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটিকে বিজয়ী করতে পারলে সমাজ থেকে অন্যায় দূর হবে।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক মুহা. জামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসভায় ১১-দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।































