গঙ্গাচড়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না: আসক
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:০০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
- / 304
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে পরিকল্পিত হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “মাত্র একটি কিশোরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যে বর্বর সহিংসতা চালানো হয়েছে, তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না।”
আসকের মতে, এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ এবং বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা সমান অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিফলন।
সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কিশোর স্থানীয় একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। পুলিশ তাকে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। কিন্তু এ ঘটনা ঘটার আগেই এলাকায় মাইকিং করে উসকানিমূলক প্রচার চালানো হয় এবং একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি সংঘবদ্ধভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় বহু বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়, এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশাসনের ভাষ্যমতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আসক বলেছে, “ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ সময়েই দোষীরা বিচার এড়িয়ে যায়, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলছে এবং বিচারহীনতার ভয়াবহ নজির সৃষ্টি করছে।”
সংগঠনটি আরও উল্লেখ করে, বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন সমতা, ধর্মচর্চার স্বাধীনতা এবং সুরক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এই মৌলিক অধিকারগুলো বারবার লঙ্ঘিত হওয়া রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই লজ্জাজনক।

এই প্রেক্ষাপটে আসক জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছে:
হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে
আক্রান্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে
ধর্মীয় উস্কানি ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে
আসক স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, “এই ঘটনার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। যারা অপরাধ করেছে এবং যারা দায়িত্বে থেকেও প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে—উভয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হবে মানবাধিকারের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পথ।”
এদিকে, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সংঘটিত হামলা প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, “ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়াবহ সহিংসতা সভ্য সমাজে একেবারেই বেমানান। একটি যুবক সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়, তারপর সেই ঘৃণার জেরে ভয়াবহ হামলা হয়; এই পরিস্থিতি জনমনে আতঙ্ক ও আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।”
জি এম কাদের বলেন, “এই ধরনের হামলা প্রমাণ করে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের হামলা একটি বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা।”
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, “দেশে যেন আর কোনোভাবে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

উল্লেখ্য, গত রোববার (২৭ জুলাই) রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ২২টি পরিবারের মধ্যে ১৯টি পরিবার এখনো নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রঞ্জন কুমার রায় ও তার চাচার পরিবারের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে জেলা প্রশাসক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে প্রশাসন রয়েছে এবং সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
রংপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু সাইম বলেন, হামলায় ১২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ২২টি পরিবার বসবাস করত। অধিকাংশ পুরুষ সদস্য বর্তমানে বাড়িতে থাকলেও, কিছু নারী সদস্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
































