ট্যাঙ্কারে ইউক্রেইনের হামলা, নিরাপদে বাংলাদেশিরা
- সর্বশেষ আপডেট ০১:০৬:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- / 77
ক্রুড অয়েল ভরার উদ্দেশ্যে মিশরের সুয়েজ বন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল ২৭৫ মিটার লম্বা চীনা জাহাজ ‘এমটি কায়রোস’। রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নভোরোসিস্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা জাহাজটি কৃষ্ণসাগর অতিক্রমের সময় তুরস্কের জলসীমা সংলগ্ন এলাকায় ইউক্রেইনের পরিচালিত ‘ড্রোন বোট’ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়। হামলার পরপরই জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে দুই ঘণ্টার মধ্যেই জাহাজটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। খবর বিডিনিউজের।
তুরস্কের কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আগুনে আক্রান্ত জাহাজটির উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং ২৫ জন নাবিককে উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও হামলার মানসিক আঘাত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তারা।
জাহাজ ‘এমটি কায়রোস’-এ থাকা অন্যান্য নাবিকদের মধ্যে ছিলেন চীনের ১৯ জন, আর মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার একজন করে নাবিক। বাংলাদেশি নাবিকদের মধ্যে ছিলেন চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম, অয়েলার হাবিবুর রহমান, পাম্পম্যান আসগর হোসাইন ও ডেক ক্যাডেট আল আমিন হোসেন। হামলার পর তাদের সবাইকে তুরস্কের ইজমিত শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রাখা হয়।
শনিবার রাতে ফোনে কথা হয় বাংলাদেশি নাবিক প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমরা মিশরের পোর্ট সুয়েজ থেকে খালি জাহাজ নিয়ে রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে যাচ্ছিলাম। বসফরাস প্রণালি পার হয়ে শুক্রবার কৃষ্ণসাগর অতিক্রম করছিলাম। তুরস্কের জলসীমার কাছাকাছি যখন পৌঁছাই, তখন স্থানীয় সময় বিকেল পৌনে ৫টার একটু আগে আমাদের জাহাজের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র আসে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি জাহাজের প্রপেলারের কাছে আঘাত হানে এবং সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠিক ১০ মিনিট পর আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের ইঞ্জিন কক্ষের ফুয়েল ট্যাংকে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে এবং ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। আগুন পুরো জাহাজে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ক্যাপ্টেন জরুরি যোগাযোগ করে তুরস্কের কোস্ট গার্ডের কাছে সহায়তা চান। দুই ঘণ্টার মধ্যেই তারা এসে আমাদের উদ্ধার করেন।”
হামলার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে মাহফুজুল জানান, “মিসাইল আঘাতের সাথে সাথে জাহাজের ভেতর দম বন্ধ করা গরম বাতাস ছুটে আসে। আগুনের শব্দ আর ধোঁয়া আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলে। তখন মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপরও আমরা ডেকে দাঁড়িয়ে উদ্ধার পাওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। বেঁচে ফেরাটা আসলেই অবিশ্বাস্য।”
অন্য তিন বাংলাদেশি নাবিকও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের সবাইকে হাসপাতালে প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা তুরস্কের ইজমিতে কোস্ট গার্ডের হেফাজতে আছেন।
মাহফুজুল বলেন, “তুরস্কের কোস্ট গার্ড সদস্যরা যেন সেই মুহূর্তে আমাদের ত্রাতা হয়ে এসেছিলেন। আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সবাই আমাদের সুস্থতার খবর পেয়েছেন।”
তবে তিনি জানিয়েছেন, তুরস্কে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এখনো কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। “আমাদের সাথে পাসপোর্ট রয়েছে, কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবুও আমরা নিজেরাই দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব,”—বলেন মাহফুজুল।
তিনি আরও জানান, হামলার ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইউক্রেইনের ড্রোন বোট থেকে ছোঁড়া হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। “সমুদ্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী ড্রোন বোটই মিসাইল নিক্ষেপ করেছে,”—বলেন তিনি।
যদিও জাহাজটিকে চীনা বলা হলেও এটি রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’-এর অংশ বলে নাবিকরা জানিয়েছেন। রাশিয়ার ক্রুড অয়েল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর দায়িত্ব জাহাজটি নিয়মিতই পালন করত। তারা জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল বোঝাই হওয়ার পর জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ছিল চীন অথবা ভারত।
কৃষ্ণসাগরে একই সময়ে ‘বিরাট’ নামের আরেকটি ট্যাঙ্কারেও নৌ-ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে এক ইউক্রেইনীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি জানান, দুটো ট্যাঙ্কারই নভোরোসিস্ক বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। এই বন্দরটি রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নৌ-ড্রোনগুলো দ্রুতগতিতে ট্যাঙ্কারগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তারপর শক্তিশালী বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। ওই কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে জানান, দুটি ট্যাঙ্কারই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে রাশিয়ার তেল পরিবহন ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাশিয়া এ হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে ইউক্রেইন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’-এর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এই নৌবহর ব্যবহার করে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়ন করছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্ল্যাক সিতে একটি জাহাজে মিসাইল হামলা হয়েছে। ওই জাহাজের ২৫ নাবিকের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছি।
এদিকে হামলা–পরবর্তী মানসিক চাপ এখনও কাটেনি বলে জানিয়েছেন নাবিকরা। বিশেষ করে চতুর্থ প্রকৌশলী মাহফুজুল ইসলাম বলেন, হামলার শব্দ, আগুন, বিস্ফোরণ-সব কিছু যেন মাথার মধ্যে ঘুরছে। আমরা বেঁচে আছি, এটাই বড় সৌভাগ্য।




































