ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কিটোফ ১০ এম. জি 

শিল্প সাহিত্য ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫
  • / 1076

লেখক তাসরিবা খান

  • কিটোফ ১০ এম. জি
  • তাসরিবা খান ।।

খবরাখবরটা কয়েকদিন ধরেই কানাঘুষা ছিল যে ইমরানের সংসারে জোড়তোড় অশান্তি চলছে । অশান্তির হেতু নাকি ইমরান নিজেই । কনক সেদিন ফোনকলে বিস্তর অভিযোগ শুনিয়ে চলছিলো । যা বুঝে আসলো ওদের মাঝে সময়টা বড়ো ফ্যাক্টর । একজন আর্কিটেক্ট তো আরেকজন ডাক্তার । দুজনের মাথায় প্রফেশনাল চিন্তার আস্তরণ এতটাই পুরু যে ভালোবাসা এক কোণে কোন রকমে ত্যানার মতো রেলিং ধরে ঝুলে আছে । একে অন্যের জন্য সময় নেই । যেটুকু দেখা হয় রাতে শোবার সময়টুকু । কোনদিন নাইট শিফট থাকলে সেটুকুও হয় না । টাকার অভাব নাই তাই নূন আনতে পান্তা ফুরানোর হিসেব করতেও বসতে হয় না । বাবুর্চি চারবেলার খাবার বানিয়ে চলছে , তাই বউয়ের হাতের রান্না বলে আদিখ্যেতা নেই আবার অভিযোগও নেই ।  হয়ত সম্পর্কে অভিযোগ না থাকাটাও বড় অভিযোগের কারণ !

এসব ভাবতে ভাবতেই হেনা ম্যাসেঞ্জারে নক করলো শোভনকে ।

– হ্যা বল ।

– কি রে, শীতের সকালে তুই এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছিস । আমি তো ভাবলাম তোকে বারোটার আগ অব্দি পাওয়া দায় ।

– শুনিস নি ? গতকাল থেকে ইমরান আমার বাসায় । ওরা সেপারেশনে চলে যাচ্ছে ।

– কনক কোথায় তাহলে ?

– ওদের বাসাতেই আছে । নতুন বাড়ি পেলে কনক’কে শিফট করে তারপর ইমরান ওই বাসায় ফিরবে ।

– বাহ বা ! বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি চলছে তাও এতো কেয়ার !

– আরেহ শালা, গেরো তো এখানেই লাগছে আমারও । ইমরান লাভস কনক । বিলীভ মী ।

– আর কনক ?

– কনকের তো ওই এক সুর । ইমরান নাকি কেয়ার করে না, ভালোবাসে না ।

– চল না একটা আউটিং করি সবাই মিলে দিন তিন চারেকের জন্য ।

– তোর কোন প্ল্যান আছে ?

– না ঠিক প্ল্যান বলি কি করি তবে যদি কিছু হয় ।

দিন সাতেকের ভেতর সবাইকে রাজি করানো গেলো তবে একদিনের জন্য । শীতের পিকনিক বা আউটডোর ইভেন্টকে খুব কম বন্ধু বান্ধবই না বলে । সে সুবাদে সবাইকেই পাওয়া গেলো । কনককে জানানো হয়নি ইমরান আসবে । দেখলে যদিও কিছুটা রেগে যাবে তবে রাগও সই যদি অভিমানের বরফ গলে চির মুছে দেয় । এই তো শেষ চেষ্টা । এরপর হয়ত কেউ কারোর মুখ দর্শন করবে না কখনও । দুজন হয়ত নতুন করে সংসার সাজাবে দুই বসতিতে । তারপর শুধুই যোজন যোজন দূরে… হেনার বেলাতেও তাই হয়েছিলো । মিছে সন্দেহের বশবর্তি হয়ে ঘর ছেড়েছিল সে, যখন বুঝতে পারলো তখন আর ফেরবার পথ নেই । যদিও সে বা রাকিব দুজনের কেউই আবার বিয়ে করেনি তবুও ফিরে যাওয়া সব সময় যায় না । তাদের বেলায় কেউ শেষ চেষ্টাটুকু করেনি তো । এক বছর হতে চললো আজও তো হেনা রাকিবকে ভাবে হয়ত আগের থেকে বেশীই ভালোবাসে এখন তবু ভয় অপরপ্রান্তে রাকিব কি তাকে ক্ষমা করবে ?

শীতের ভোরে গিজার অন রেখে গরম পানিতে গোসল করেও হাড় কাঁপানো ভাবটা শরীর থেকে যাচ্ছে না । কালো শাড়ির উপর লং কোট চাপিয়ে নিয়েও গলায় শালটা বেশ করে পেঁচিয়ে নিলো । হেনার শ্বাসকষ্ট বরাবর এবং তা ভয়ানক রকমের । শীতের সময় তা জাঁকিয়ে বসে আরও বেশী । আগে নিয়ম করে কিটোফ ১০ এম.জি খাওয়াতো রাকিব । তার দরকারী ওষুধগুলো নিজের সাথেই রাখতো, বিশেষ করে শীতকালে । তখন বেশ আরামে থাকতো হেনা । এখন বাস্তবতা আলাদা । হয়ত কিছুটা নিজের উপর জেদ করেই অষুধ আর খায় না সে ।

নীচে গাড়ির হর্ণ বাজছে । ওরা বোধ হয় এসে গেছে । তাড়াহুড়ো করে কিছু কালো চুড়ি আর কালো টিপটা পরেই ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে বের হয়ে পড়লো । এই ফ্ল্যাটে একাই থাকে সে । ঠিক একাও নয় মিশে আছে রাকিবের অভ্যাস । হেনা তাই দূর ছায়া রাকিবের সাথেই কথা বলে একা একা । গাড়িতে উঠতে না উঠতেই মনে হলো কলেজে ফিরে গেছে সবাই । উদ্দীপনা আর গল্প আর হৈ চৈ’ এর মাঝে হেনার থেকে থেকে শ্বাসকষ্টটা উঠছে । গলার স্বর কিছুটা ভারী হয়ে আসছে তবু সেদিকে পাত্তা দিচ্ছে না এবেলা সে । শীতের কাঁপন লাগানো বাতাস বরং আরও কিছুটা উপভোগ করতে মুখ বাড়িয়ে দিল কুয়াশা গিলে খেতে । কুয়াশা হেনার বড়ো প্রিয় । সামনে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না । মোটা ভারী কুয়াশা ।

দূরের গ্রামে নিস্তব্ধতা , এদিকটায় নামলো সবাই । পাঁচটা গাড়িতে করে সাতাশজন এসেছে ওরা । সবার সাথে এখনও দেখা হয়নি । হিম শীতে গুঁটিশুটি হইয়ে বাজার বসেছে কেবল । গ্রামের বাজার থেকে হাঁস কিনলো ডজন খানেক । শীতের পিকনিক মানেই হাঁসের একটা প্রচলন থাকে । সে হাঁস ভাজা ভাজা করে রান্না করা হয় বড়ো পাতিলে । কলেজ জীবনে কলাপাতায় খেলেও এখন ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস এসবই কেনা হলো যাত্রা পথে,  সাথে চাল, ডাল, মসলা । ঢাকার তুলনায় এখানের ফুলকপি গুলো বেশ বড়ো বড়ো । তরূণ কয়েকটা ফুলকপিও কিনলো , নতুন আলু কেজি দশেক কিনলো । শোভন এক বস্তা চাল কিনলো বাজার থেকে , গাড়ির পেছনে উঠাতে উঠাতে বললো  –  “তোদের কারো চাল লাগলে কিনতে পারিস ” আলুও যা রান্না হবে তা হবে বাকিটা সবাই ভাগাভাগি করে নিয়ে নিবে বাসায় । শহরে এমন নতুন আলু দাম দিয়ে কিনলেও পাওয়া দায় । হেনা মুচকি হাসলো, মনে মনে ভাবলো – সবাই বড়ো সংসারী আজকাল । বয়স্টা হয়েছে তো । ওদিকে খেঁজুরের রস খাবার জন্য অনেকে পায়তারা করলেও কিছু অতি সচেতনদের ভীড়ে খাওয়া না খাওয়ার দোটানা চলছে ।

কেবল ফসল তুলেছে এমন একটা জমির ধারে রাখা হয়েছে গাড়ি । দূরে সরিষা ক্ষেত  কেবল সকালের সূর্য উঠেছে । মূলার শাকের ঘ্রাণ ভেসে আসছে বাতাসে । মেয়েরা চিতই পিঠা দিয়ে ধনিয়াপাতার ভর্তা খেতে খেতে গল্পে মত্ত , এদিকে ছেলেরা জমির চাষার সাথে কথা বলে জমির ধারে একটা চুলা বানানোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে । গ্রামের কিছু আশেপাশের মানুষ অতি উৎসাহে তাদেরকে সাহায্য করছে । মহুয়া উঠে যেয়ে এয়ার ম্যাট্রেসগুলো পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে নিচ্ছে । হেনা, তনি ওরাও জোগাড়ে হাত লাগালো ।

পাশের গ্রামের মেয়ে বউরা শাল জড়িয়ে ধনিয়া পাতা বেছে দিতে লাগলো ওদেরকে । ওদের শরীর থেকে ফেয়ার এন্ড লাভলী’র ঘ্রাণ আসছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌষের বাতাসে সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো । শহর থেকে কেউ আসলে গ্রামীণ মানুষগুলো যে ভালোবাসা দেয় তা সঠিক মূল্যায়ন কি শহুরে ভালোবাসা তাদেরকে দিতে পারে ? শহরের মানুষের ভালোবাসায় সংকীর্ণতা আছে । নিজেদের ঘর টিকানোই দায় তাদের অচেনা মানুষকে কি আর ভালোবাসবে এরা ?

দুপুরে হাঁস ভুনা খাবার পর থেকেই শ্বাসকষ্ট আরও চাড়া দিয়ে উঠেছে হেনার । জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতেই ভাবছিলো, শুধু শুধুই আসা হলো । কনক আসেনি । ইমরান এসেছে তবু চুপচাপ । লাভের লাভ কিছু হলো না । খিঁচুনি উঠছে মনে হয় , শালটা কান থেকে আরেকবার পেঁচিয়ে নিয়ে ব্যাগ হাঁতড়ে অষুধ খুঁজতে লাগলো সে । মনে মনে ভাবলো, আজ বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারবে নাকি তাও সংশয় ।

– অষুধ কবেই বা তোমার ব্যাগে রেখেছো ?

পকেট থেকে কিটোফ ১০ এম.জি বের করতে করতে রাকিব চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ।

– কেমন আছো ?

– এসব জানতে চাওয়ার থেকে জরুরি অষুধটা খাওয়া । নাও আগে ওষুধটা খাও তো ।

কথা না বাড়িয়ে হেনা ওষুধ ঢোক গিলে খেলো । রাকিবকে সে খেয়াল করেনি এতোক্ষণ । দেখতে পেলে সে-ই আগে যেয়ে কথা বলতো । কিন্তু এখন কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না ।

– এখনও কিটোফ পকেটে নিয়ে ঘুরো ?

– হ্যাঁ । সেই কলেজ থেকেই তো তোমার এই অষুধটা আমার পকেটে থাকে । তিন মাস পর পর নিয়ম করে বদলে ফেলি এক্সপায়েরিটি শেষ হয়ে যায় বলে । শীতকাল আসলে ইনহেলার’ও রাখি সাথে । এই যে দেখো ।

– আমার সাথে তো দেখা হবার সুযোগ নেই তবু কেন ?

– দেখা না হলেই বুঝি যত্ন করা বন্ধ করে দিতে হয় ?  হয়ত এখনও তোমাকে নিজের শেষটুকু দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাই বলে । হয়ত ভালোবাসি বলে….

হেনা চোখের পানি আটকে রাখতে পারলো না । অভিমান ভুলে কত উত্তাপ নিয়ে ভালোবাসার কথা বলছে রাকিব । শ্বাস জোরে জোরে টানতে টানতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, মাফ করে দিও আমাকে তুমি । আমি তোমাকে মিথ্যে সন্দেহ করেছিলাম ।

– তাহলে এতোদিন বলোনি কেনো ?

– লজ্জায় । আবার ভেবেছি তুমি যদি অন্য কোথাও…

রাকিব, হেনার ঠোঁটে আংগুল ছুঁয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো –

– তুমিই আমার জীবনের একমাত্র মালাকর ।

– এতোদিন বলোনি কেনো ?

– আসছে শীতকালের অপেক্ষায় ছিলাম । তোমাকে কুয়াশায় ভেজাবো বলে ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

কিটোফ ১০ এম. জি 

সর্বশেষ আপডেট ১২:৪৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫
  • কিটোফ ১০ এম. জি
  • তাসরিবা খান ।।

খবরাখবরটা কয়েকদিন ধরেই কানাঘুষা ছিল যে ইমরানের সংসারে জোড়তোড় অশান্তি চলছে । অশান্তির হেতু নাকি ইমরান নিজেই । কনক সেদিন ফোনকলে বিস্তর অভিযোগ শুনিয়ে চলছিলো । যা বুঝে আসলো ওদের মাঝে সময়টা বড়ো ফ্যাক্টর । একজন আর্কিটেক্ট তো আরেকজন ডাক্তার । দুজনের মাথায় প্রফেশনাল চিন্তার আস্তরণ এতটাই পুরু যে ভালোবাসা এক কোণে কোন রকমে ত্যানার মতো রেলিং ধরে ঝুলে আছে । একে অন্যের জন্য সময় নেই । যেটুকু দেখা হয় রাতে শোবার সময়টুকু । কোনদিন নাইট শিফট থাকলে সেটুকুও হয় না । টাকার অভাব নাই তাই নূন আনতে পান্তা ফুরানোর হিসেব করতেও বসতে হয় না । বাবুর্চি চারবেলার খাবার বানিয়ে চলছে , তাই বউয়ের হাতের রান্না বলে আদিখ্যেতা নেই আবার অভিযোগও নেই ।  হয়ত সম্পর্কে অভিযোগ না থাকাটাও বড় অভিযোগের কারণ !

এসব ভাবতে ভাবতেই হেনা ম্যাসেঞ্জারে নক করলো শোভনকে ।

– হ্যা বল ।

– কি রে, শীতের সকালে তুই এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছিস । আমি তো ভাবলাম তোকে বারোটার আগ অব্দি পাওয়া দায় ।

– শুনিস নি ? গতকাল থেকে ইমরান আমার বাসায় । ওরা সেপারেশনে চলে যাচ্ছে ।

– কনক কোথায় তাহলে ?

– ওদের বাসাতেই আছে । নতুন বাড়ি পেলে কনক’কে শিফট করে তারপর ইমরান ওই বাসায় ফিরবে ।

– বাহ বা ! বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি চলছে তাও এতো কেয়ার !

– আরেহ শালা, গেরো তো এখানেই লাগছে আমারও । ইমরান লাভস কনক । বিলীভ মী ।

– আর কনক ?

– কনকের তো ওই এক সুর । ইমরান নাকি কেয়ার করে না, ভালোবাসে না ।

– চল না একটা আউটিং করি সবাই মিলে দিন তিন চারেকের জন্য ।

– তোর কোন প্ল্যান আছে ?

– না ঠিক প্ল্যান বলি কি করি তবে যদি কিছু হয় ।

দিন সাতেকের ভেতর সবাইকে রাজি করানো গেলো তবে একদিনের জন্য । শীতের পিকনিক বা আউটডোর ইভেন্টকে খুব কম বন্ধু বান্ধবই না বলে । সে সুবাদে সবাইকেই পাওয়া গেলো । কনককে জানানো হয়নি ইমরান আসবে । দেখলে যদিও কিছুটা রেগে যাবে তবে রাগও সই যদি অভিমানের বরফ গলে চির মুছে দেয় । এই তো শেষ চেষ্টা । এরপর হয়ত কেউ কারোর মুখ দর্শন করবে না কখনও । দুজন হয়ত নতুন করে সংসার সাজাবে দুই বসতিতে । তারপর শুধুই যোজন যোজন দূরে… হেনার বেলাতেও তাই হয়েছিলো । মিছে সন্দেহের বশবর্তি হয়ে ঘর ছেড়েছিল সে, যখন বুঝতে পারলো তখন আর ফেরবার পথ নেই । যদিও সে বা রাকিব দুজনের কেউই আবার বিয়ে করেনি তবুও ফিরে যাওয়া সব সময় যায় না । তাদের বেলায় কেউ শেষ চেষ্টাটুকু করেনি তো । এক বছর হতে চললো আজও তো হেনা রাকিবকে ভাবে হয়ত আগের থেকে বেশীই ভালোবাসে এখন তবু ভয় অপরপ্রান্তে রাকিব কি তাকে ক্ষমা করবে ?

শীতের ভোরে গিজার অন রেখে গরম পানিতে গোসল করেও হাড় কাঁপানো ভাবটা শরীর থেকে যাচ্ছে না । কালো শাড়ির উপর লং কোট চাপিয়ে নিয়েও গলায় শালটা বেশ করে পেঁচিয়ে নিলো । হেনার শ্বাসকষ্ট বরাবর এবং তা ভয়ানক রকমের । শীতের সময় তা জাঁকিয়ে বসে আরও বেশী । আগে নিয়ম করে কিটোফ ১০ এম.জি খাওয়াতো রাকিব । তার দরকারী ওষুধগুলো নিজের সাথেই রাখতো, বিশেষ করে শীতকালে । তখন বেশ আরামে থাকতো হেনা । এখন বাস্তবতা আলাদা । হয়ত কিছুটা নিজের উপর জেদ করেই অষুধ আর খায় না সে ।

নীচে গাড়ির হর্ণ বাজছে । ওরা বোধ হয় এসে গেছে । তাড়াহুড়ো করে কিছু কালো চুড়ি আর কালো টিপটা পরেই ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে বের হয়ে পড়লো । এই ফ্ল্যাটে একাই থাকে সে । ঠিক একাও নয় মিশে আছে রাকিবের অভ্যাস । হেনা তাই দূর ছায়া রাকিবের সাথেই কথা বলে একা একা । গাড়িতে উঠতে না উঠতেই মনে হলো কলেজে ফিরে গেছে সবাই । উদ্দীপনা আর গল্প আর হৈ চৈ’ এর মাঝে হেনার থেকে থেকে শ্বাসকষ্টটা উঠছে । গলার স্বর কিছুটা ভারী হয়ে আসছে তবু সেদিকে পাত্তা দিচ্ছে না এবেলা সে । শীতের কাঁপন লাগানো বাতাস বরং আরও কিছুটা উপভোগ করতে মুখ বাড়িয়ে দিল কুয়াশা গিলে খেতে । কুয়াশা হেনার বড়ো প্রিয় । সামনে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না । মোটা ভারী কুয়াশা ।

দূরের গ্রামে নিস্তব্ধতা , এদিকটায় নামলো সবাই । পাঁচটা গাড়িতে করে সাতাশজন এসেছে ওরা । সবার সাথে এখনও দেখা হয়নি । হিম শীতে গুঁটিশুটি হইয়ে বাজার বসেছে কেবল । গ্রামের বাজার থেকে হাঁস কিনলো ডজন খানেক । শীতের পিকনিক মানেই হাঁসের একটা প্রচলন থাকে । সে হাঁস ভাজা ভাজা করে রান্না করা হয় বড়ো পাতিলে । কলেজ জীবনে কলাপাতায় খেলেও এখন ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাস এসবই কেনা হলো যাত্রা পথে,  সাথে চাল, ডাল, মসলা । ঢাকার তুলনায় এখানের ফুলকপি গুলো বেশ বড়ো বড়ো । তরূণ কয়েকটা ফুলকপিও কিনলো , নতুন আলু কেজি দশেক কিনলো । শোভন এক বস্তা চাল কিনলো বাজার থেকে , গাড়ির পেছনে উঠাতে উঠাতে বললো  –  “তোদের কারো চাল লাগলে কিনতে পারিস ” আলুও যা রান্না হবে তা হবে বাকিটা সবাই ভাগাভাগি করে নিয়ে নিবে বাসায় । শহরে এমন নতুন আলু দাম দিয়ে কিনলেও পাওয়া দায় । হেনা মুচকি হাসলো, মনে মনে ভাবলো – সবাই বড়ো সংসারী আজকাল । বয়স্টা হয়েছে তো । ওদিকে খেঁজুরের রস খাবার জন্য অনেকে পায়তারা করলেও কিছু অতি সচেতনদের ভীড়ে খাওয়া না খাওয়ার দোটানা চলছে ।

কেবল ফসল তুলেছে এমন একটা জমির ধারে রাখা হয়েছে গাড়ি । দূরে সরিষা ক্ষেত  কেবল সকালের সূর্য উঠেছে । মূলার শাকের ঘ্রাণ ভেসে আসছে বাতাসে । মেয়েরা চিতই পিঠা দিয়ে ধনিয়াপাতার ভর্তা খেতে খেতে গল্পে মত্ত , এদিকে ছেলেরা জমির চাষার সাথে কথা বলে জমির ধারে একটা চুলা বানানোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে । গ্রামের কিছু আশেপাশের মানুষ অতি উৎসাহে তাদেরকে সাহায্য করছে । মহুয়া উঠে যেয়ে এয়ার ম্যাট্রেসগুলো পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে নিচ্ছে । হেনা, তনি ওরাও জোগাড়ে হাত লাগালো ।

পাশের গ্রামের মেয়ে বউরা শাল জড়িয়ে ধনিয়া পাতা বেছে দিতে লাগলো ওদেরকে । ওদের শরীর থেকে ফেয়ার এন্ড লাভলী’র ঘ্রাণ আসছে । কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌষের বাতাসে সেই ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়লো । শহর থেকে কেউ আসলে গ্রামীণ মানুষগুলো যে ভালোবাসা দেয় তা সঠিক মূল্যায়ন কি শহুরে ভালোবাসা তাদেরকে দিতে পারে ? শহরের মানুষের ভালোবাসায় সংকীর্ণতা আছে । নিজেদের ঘর টিকানোই দায় তাদের অচেনা মানুষকে কি আর ভালোবাসবে এরা ?

দুপুরে হাঁস ভুনা খাবার পর থেকেই শ্বাসকষ্ট আরও চাড়া দিয়ে উঠেছে হেনার । জোরে জোরে শ্বাস টানতে টানতেই ভাবছিলো, শুধু শুধুই আসা হলো । কনক আসেনি । ইমরান এসেছে তবু চুপচাপ । লাভের লাভ কিছু হলো না । খিঁচুনি উঠছে মনে হয় , শালটা কান থেকে আরেকবার পেঁচিয়ে নিয়ে ব্যাগ হাঁতড়ে অষুধ খুঁজতে লাগলো সে । মনে মনে ভাবলো, আজ বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারবে নাকি তাও সংশয় ।

– অষুধ কবেই বা তোমার ব্যাগে রেখেছো ?

পকেট থেকে কিটোফ ১০ এম.জি বের করতে করতে রাকিব চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ।

– কেমন আছো ?

– এসব জানতে চাওয়ার থেকে জরুরি অষুধটা খাওয়া । নাও আগে ওষুধটা খাও তো ।

কথা না বাড়িয়ে হেনা ওষুধ ঢোক গিলে খেলো । রাকিবকে সে খেয়াল করেনি এতোক্ষণ । দেখতে পেলে সে-ই আগে যেয়ে কথা বলতো । কিন্তু এখন কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না ।

– এখনও কিটোফ পকেটে নিয়ে ঘুরো ?

– হ্যাঁ । সেই কলেজ থেকেই তো তোমার এই অষুধটা আমার পকেটে থাকে । তিন মাস পর পর নিয়ম করে বদলে ফেলি এক্সপায়েরিটি শেষ হয়ে যায় বলে । শীতকাল আসলে ইনহেলার’ও রাখি সাথে । এই যে দেখো ।

– আমার সাথে তো দেখা হবার সুযোগ নেই তবু কেন ?

– দেখা না হলেই বুঝি যত্ন করা বন্ধ করে দিতে হয় ?  হয়ত এখনও তোমাকে নিজের শেষটুকু দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাই বলে । হয়ত ভালোবাসি বলে….

হেনা চোখের পানি আটকে রাখতে পারলো না । অভিমান ভুলে কত উত্তাপ নিয়ে ভালোবাসার কথা বলছে রাকিব । শ্বাস জোরে জোরে টানতে টানতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো, মাফ করে দিও আমাকে তুমি । আমি তোমাকে মিথ্যে সন্দেহ করেছিলাম ।

– তাহলে এতোদিন বলোনি কেনো ?

– লজ্জায় । আবার ভেবেছি তুমি যদি অন্য কোথাও…

রাকিব, হেনার ঠোঁটে আংগুল ছুঁয়ে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো –

– তুমিই আমার জীবনের একমাত্র মালাকর ।

– এতোদিন বলোনি কেনো ?

– আসছে শীতকালের অপেক্ষায় ছিলাম । তোমাকে কুয়াশায় ভেজাবো বলে ।