কার্গো ভিলেজ কী, সেখানে কী থাকে
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:১৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
- / 182
একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অদৃশ্য প্রাণকেন্দ্র লুকিয়ে থাকে বিমানবন্দরের এক কোণে—যেখানে সাধারণ যাত্রীরা প্রবেশ করেন না। এই অংশটিই হলো কার্গো ভিলেজ বা কার্গো কমপ্লেক্স। নাম শুনলেই বোঝা যায়, এটি পণ্য আমদানি ও রপ্তানির কেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য আসে ও যায়, আর সম্পন্ন হয় জটিল শুল্কায়ন প্রক্রিয়া।
আমরা জানি, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি প্রধান বিভাগ থাকে—একটি যাত্রী পরিবহনের জন্য, আরেকটি পণ্য পরিবহনের জন্য। যাত্রীরা টার্মিনাল ভবনে তাদের পাসপোর্ট ও লাগেজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর ঠিক সেই সময়, বিমানবন্দরের অন্য পাশে, বিশাল গুদাম ও প্রশাসনিক ভবনে চলছে আরেক দুনিয়া—কার্গো ভিলেজের ব্যস্ততা।
পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় তিনভাবে—স্থলপথে, সমুদ্রপথে এবং আকাশপথে। এর মধ্যে আকাশপথ সবচেয়ে দ্রুত, কিন্তু ব্যয়বহুল। তাই এখানে সাধারণত এমন পণ্যই আসে বা যায় যেগুলো পচনশীল, জরুরি, বা উচ্চমূল্যের। যেমন—তৈরি পোশাক, ওষুধ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, ফুল, ফলমূল, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রও।
বিশ্বখ্যাত কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমান সংস্থাগুলো যেমন ডিএইচএল, ফেডেক্স, এমিরেটস স্কাইকার্গো বা কাতার এয়ারওয়েজ কার্গো—এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও চলে এখান থেকেই। কার্গো ভিলেজ মূলত এক বিশাল গুদামঘর ও প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে প্রতিটি পণ্যের আগমন ও প্রস্থান নির্ধারিত নিয়মে সম্পন্ন হয়।
কোনো পণ্য বিদেশ থেকে বিমানবন্দরে নামার পরপরই তা সরাসরি মালিকের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। প্রথমেই শুরু হয় শুল্কায়ন প্রক্রিয়া—যেখানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখেন পণ্যের ধরন, মূল্য, উৎস ও শুল্ক পরিমাণ। এই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করার জন্যই পণ্য রাখা হয় কার্গো ভিলেজে।
অন্যদিকে, রপ্তানিমুখী পণ্যও বিমানবন্দরে আনার পর সরাসরি বিমানে তোলা হয় না। রপ্তানির আগে প্রয়োজন হয় বিমান সংস্থার অনুমতি, প্যাকেজিং যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং কাস্টমস ছাড়পত্র। সবই সম্পন্ন হয় কার্গো ভিলেজের ভেতরেই।

বড় বিমানবন্দরগুলোতে সাধারণত আমদানি ও রপ্তানির জন্য আলাদা আলাদা কার্গো কমপ্লেক্স থাকে। যেমন—হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আছে “আমদানি কার্গো ভিলেজ” ও “রপ্তানি কার্গো ভিলেজ”। আমদানি কমপ্লেক্সে বিদেশ থেকে আসা পণ্য রাখা হয় যতক্ষণ না তা শুল্কায়ন শেষ করে মালিক বুঝে নিচ্ছেন। আর রপ্তানি কমপ্লেক্সে দেশ থেকে পাঠানো পণ্য রাখা হয় বিমানে ওঠানোর আগে।
কার্গো ভিলেজের ভেতরে থাকে বিভিন্ন সুবিধা—
• পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ,
• ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য নিরাপদ সংরক্ষণ কক্ষ,
• কাস্টমস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অফিস,
• নিরাপত্তা স্ক্যানিং ব্যবস্থা,
• কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য প্রশাসনিক ব্লক,
এবং পণ্যের গন্তব্য নির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র।
কার্গো ভিলেজের প্রতিটি চালান নিবন্ধিত হয় ডিজিটাল ডেটাবেসে। পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কোন বিমানে উঠবে, কোন দেশে যাবে—সবকিছু ট্র্যাক করা হয় বারকোড ও স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে। তাই এখানে নিরাপত্তা ও তথ্যব্যবস্থাপনা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কার্গো ভিলেজ মূলত এক ‘লজিস্টিক হাব’, যেখানে বিমানবন্দর, কাস্টমস, ব্যাংক ও বাণিজ্যিক সংস্থা—সবাই একসঙ্গে কাজ করে।
একটি পণ্যের চালান এখানে কতক্ষণ থাকবে, তা নির্ভর করে তার প্রকৃতি ও কাগজপত্রের ওপর। পচনশীল পণ্য যেমন শাকসবজি বা ফুল সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু জটিল যন্ত্রপাতি, বিলাসপণ্য কিংবা বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত চালান কয়েক দিন, এমনকি সপ্তাহখানেকও থাকতে পারে।
রপ্তানিকারকেরা লিড টাইম বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে কার্গো ভিলেজের ওপর নির্ভর করেন। এখানকার দক্ষতা ও সময়ানুবর্তিতা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নির্ধারণ করে।
প্রতিটি কার্গো ভিলেজেই থাকে নিরাপত্তা রিং। এখানে প্রবেশের আগে পাস নিতে হয়, পণ্য স্ক্যান হয় একাধিকবার। কারণ, পণ্যের সঙ্গে কখনো কখনো থাকে মূল্যবান সামগ্রী, আবার কখনো সরকারি বা সামরিক নথি। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা হয় আন্তর্জাতিক মানে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কার্গো ভিলেজ কেবল আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র নয়—এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও। বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনাল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে কয়েকশ টন পণ্য আসে ও যায়, যার আর্থিক মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি।
কার্গো ভিলেজে শুধু সরকারি সংস্থা নয়, বাণিজ্যিক ব্যাংক, কুরিয়ার সার্ভিস, বিমা প্রতিনিধি, এমনকি ফরোয়ার্ডিং এজেন্টরাও কাজ করেন। একটি পণ্য বিমানে উঠতে হলে এই সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। ফলে কার্গো ভিলেজকে বলা হয়—“বাণিজ্য ও প্রশাসনের মিলনমঞ্চ”।
কার্গো ভিলেজ—শব্দটা সাধারণের কাছে হয়তো অপরিচিত, কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতির প্রতিটি স্পন্দনে এর ছোঁয়া আছে। এখানেই তৈরি হয় বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি, এখানেই নির্ধারিত হয় এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ভবিষ্যৎ।



































