উপদেষ্টা পরিষদে বিদায়ের সুর!
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৪:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৫
- / 208
অন্তর্বর্তী সরকারের এক প্রভাবশালী উপদেষ্টাকে সম্প্রতি একটি সংগঠনের আলোচনাসভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তাঁর একান্ত সচিব জানিয়ে দেন, স্যার এখন বাইরে যাওয়ার সময় মনে করছেন না— তিনি বলেছেন, “এখন মনোযোগ দিতে হবে বাকি সংস্কারগুলোর দিকে। আমরা আর কদিন আছি, যেকোনো দিন চলে যেতে হতে পারে।”
এমন অভিব্যক্তি শুধু একজনের নয়— সচিবালয়ের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার দপ্তরেও অনিষ্পন্ন কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে পরিষদের ভেতরে পরিবর্তনের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছে।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে বড় রদবদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অভিযোগ তুলেছে, পরিষদের কিছু সদস্য “দলীয়” ও “বিতর্কিত” আচরণে জড়িত। এই দাবির প্রেক্ষিতেই নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের আলোচনা চলছে বলে সূত্র জানায়।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের “তাড়াহুড়া” দেখা দিয়েছে। তবে কেউ প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন উপদেষ্টার একান্ত সচিব বলেন, “স্যাররা বলছেন, আমাদের সময় শেষের দিকে। যেকোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে।”
এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেছিলেন, অনেক উপদেষ্টা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং “সেফ এক্সিট” বা নিরাপদ বিদায়ের পথ খুঁজছেন। জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও অভিযোগ করেছেন, কিছু উপদেষ্টা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। এসব অভিযোগে উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দুই ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা হলেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সূত্রের মতে, মাহফুজ আলম নির্বাচন না করে সরকারে থাকতে চান, আর আসিফ মাহমুদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। বর্তমানে পরিষদে প্রধান উপদেষ্টাসহ মোট ২৩ জন সদস্য রয়েছেন, যার মধ্যে দুজন ছাত্র প্রতিনিধি।
এদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তিন প্রধান দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি প্রশ্ন তুলেছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “সরকারে কোনো দলীয় ব্যক্তি থাকলে তাঁদের অপসারণ করতে হবে।”
বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বিএনপি পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কোনো বিতর্কিত কর্মকর্তা নির্বাচনে যুক্ত না থাকেন এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে সাজানো হয়।
একই সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে একই দাবি তোলে। জামায়াতের নায়েবে আমির তাহের বলেন, “নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ কর্মকর্তা এখনো একটি দলের প্রভাবাধীন। আমরা বলেছি, নির্বাচনের আগে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে রদবদল করুন।”
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “জনপ্রশাসনে দলীয়করণ হয়েছে এবং উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যেও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেখা যাচ্ছে। যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা দলীয়করণের অভিযোগ আছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “স্বজনপ্রীতিবাজ কিছু উপদেষ্টার কারণে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। শুধু কর্মকর্তাদের নয়, উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরও সংস্কার দরকার।”
রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং নির্বাচনপূর্ব প্রশাসনিক পরিবর্তনের আলোচনার মধ্যে অনেক উপদেষ্টা এখন “সসম্মানে বিদায়” নেওয়ার চিন্তা করছেন। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সেই প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ































