সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের বিস্তার কতদূর যাবে?
- সর্বশেষ আপডেট ১০:০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
- / 247
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাত ক্রমেই সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। ইরানের নজিরবিহীন পাল্টা হামলার প্রেক্ষিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা চাইলে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও তাতে সাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এতে আশঙ্কা বাড়ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে—যা গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ইরানকে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” করতে আহ্বান জানিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যদিও তাঁর আগের বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আক্রান্ত না হলে যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। এখন তাঁর অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো, বিশেষত ইরাক, ইয়েমেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নানা পক্ষ এতে জড়াতে পারে। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে, এবং এক পর্যায়ে যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলোও এতে সম্পৃক্ত হতে পারে। এর ফলে ইরানের ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা যেমন তৈরি হবে, তেমনি বিশ্ব অর্থনীতি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার মারাত্মক ব্যাঘাতে পড়বে।
তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন অস্ত্র রয়েছে যা ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে ধ্বংস করতে সক্ষম। ইসরায়েল ইতোমধ্যে ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত করলেও তা ছিল সীমিত।
ইরানও ইতোমধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ‘ফাত্তাহ-১’ নামের নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে তারা, যা ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এই সংঘাতে এরই মধ্যে শত শত মানুষের মৃত্যু ও সহস্রাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও অস্ত্র কারখানায় অন্তত ৪০টি হামলা চালানো হয়েছে। সাইবার যুদ্ধেও ইসরায়েল সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের ঘাঁটিগুলোতে দ্রুতগতিতে কে সি-১৩৫ ট্যাঙ্কার বিমান পাঠিয়েছে, যা একটি বড় সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত বহন করে। এদিকে তাদের বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস নিমিটজ’ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে।
তেহরান থেকে জানানো হয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়, তাহলে ইরাক ও অন্যান্য আরব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের প্রথম লক্ষ্য হবে। হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন এবং লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে হামলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে ইরান।
তবে ইরান আশাবাদী যে, তাদের প্রতিবেশী আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। ইরান দাবি করছে, তারা ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া ‘দায়িত্বশীল ও নিয়ন্ত্রিত’।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেছেন এবং সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখিয়েছেন। রাশিয়া সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মন্তব্য করেছেন, “বিশ্ব এখন বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক মিলিমিটার দূরে।” ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার কারণে এই উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এখন আর শুধু সীমিত পরিসরের কোনো দ্বন্দ্ব নয়। এটা এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পরাশক্তিদের অংশগ্রহণ এই সংকটকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই পরিস্থিতি কূটনৈতিকভাবে সামাল না দিলে, মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে পুরো বিশ্ব।




































