অভ্যন্তরীণ বিরোধ বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
- / 119
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এখন সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। কূটনৈতিক তৎপরতা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও প্রার্থী বাছাই—সব দিকেই কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে দলটি। আসন্ন নির্বাচনে ঐক্য রক্ষা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন—এই তিন বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বিএনপির হাইকমান্ড।
দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জন্য তিনটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—(১) যেকোনো মূল্যে ঐক্য ধরে রাখা, (২) বিশৃঙ্খলা বা বিভেদ না সৃষ্টি করা, এবং (৩) যাকে দল মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে সবাই একযোগে কাজ করা। এই নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
ঐক্যের বার্তা ও কঠোর সতর্কতা
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। এসব বৈঠকে দেওয়া হচ্ছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা—“দলীয় ঐক্য নষ্টের চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, এবং কেবল জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীই মনোনয়ন পাবেন।”
তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ডাকার ক্ষেত্রে কিছু অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক সম্পাদক বা শীর্ষ নেতার পছন্দের বাইরে থাকলে অনেককে আমন্ত্রণ জানানো হয় না, আবার বিদেশে অবস্থানরতদের অনেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্যই পাননি।
বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে শৃঙ্খলাভঙ্গ, চাঁদাবাজি, দলীয় বিভেদ ও অসদাচরণের অভিযোগে প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, শোকজ বা পদাবনতি সহ বিভিন্ন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মির্জা ফখরুলের নির্দেশনা
গত রোববার গুলশান কার্যালয়ে সিলেট বিভাগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠকে তিনি তারেক রহমানের বার্তা পৌঁছে দিয়ে বলেন, “দল একাধিক জরিপের মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থী বেছে নেবে। যিনি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। দলীয় ঐক্য নষ্টের কোনো প্রচেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না।”
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, “আমরা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছি। চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর সবাইকে মনোমালিন্য ভুলে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে একযোগে কাজ করতে হবে।” তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে তরুণ, পেশাজীবী ও নারী প্রার্থীরাও যথেষ্ট অগ্রাধিকার পাবেন।
অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসনের চ্যালেঞ্জ
দলের ভেতরের বিভাজন এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে অনিয়ম, কোন্দল ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ জমা পড়ছে। সম্প্রতি চাঁদপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রাম ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এমন অভিযোগ এসেছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা বিভেদ সৃষ্টিকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি জানান, সম্প্রতি রায়পুরা উপজেলা বিএনপির এক সভায় বিভ্রান্তিকর ও হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় উপজেলা কমিটির সব সাংগঠনিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
কঠোর অবস্থানে স্থায়ী কমিটি
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে আমরা কোনো অপরাধীকে ছাড় দিইনি। কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে অন্যায় করে, তার দায় বিএনপি নেবে না। অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের জন্য দলে কোনো জায়গা নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা চাই বিএনপি জনগণের কাছে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও নীতিনিষ্ঠ দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করুক। এজন্য যারাই বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংক্ষেপে বলা যায়, বিএনপি এখন প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় কঠোরতা ও শৃঙ্খলার নীতি অনুসরণ করছে। দলীয় ঐক্য বজায় রাখা, জনপ্রিয় প্রার্থী নির্বাচন ও ভেতরের বিভেদ নিরসন—এই তিন দিকেই জোর দিচ্ছে হাইকমান্ড। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কেন্দ্রীয় নজরদারির এই সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বিএনপি আগামী নির্বাচনের জন্য একটি “শৃঙ্খলিত প্রস্তুতি অভিযান” হিসেবেই দেখছে।
































