অনহারেই মৃত্যু, গাজা সীমান্তে ২২ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক
- সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩৩:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ অগাস্ট ২০২৫
- / 158
গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার প্রতি তিনজনের দুজনই বর্তমানে দুর্ভিক্ষের মধ্যে রয়েছেন। প্রতিদিন অনাহারে মৃত্যুর খবর আসছে। সর্বশেষ সোমবারও আরও পাঁচজন ফিলিস্তিনি অনাহারে মারা গেছেন। অথচ গাজা সীমান্তে অপেক্ষমাণ ২২ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাককে ইসরায়েল প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কর্মীরাও খাদ্যাভাবে রাত কাটাচ্ছেন। সংস্থাটির এক কর্মী মানার বলেন, “প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি এই ভেবে, আজ আবার কোথাও বোমা পড়বে কি না। বাড়ি হারিয়েছি, কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। পানির অভাব, খাবার নেই; সব মিলিয়ে প্রতিদিন এক ভয়াবহ সংগ্রাম।”
সেভ দ্য চিলড্রেনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক আহমাদ আলহেনদাওয়ি বলেন, “গাজার শিশুদের অবস্থা বিশেষভাবে ভয়াবহ। তারা শুধু বোমার ভয়েই আতঙ্কিত নয়, বরং বেঁচে গেলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে আসতে পারবে কি না, সেটাও প্রশ্ন।”
গাজার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাক ত্রাণের প্রয়োজন হলেও গত শুক্রবার ইসরায়েল মাত্র ৭৩টি ট্রাক প্রবেশ করতে দেয়। অর্থাৎ প্রয়োজনের ১২ ভাগের এক ভাগও ঢুকতে পারছে না।
আনাদোলু এজেন্সির তথ্য মতে, সীমান্তে আটকে থাকা হাজার হাজার ট্রাকের মধ্যে রয়েছে খাদ্য, ওষুধ, শিশুদের বিশেষ পুষ্টিকর খাবার ও পানি; সব জরুরি জিনিস। অথচ এ ত্রাণ পৌঁছানোর অনুমতি নেই।
উত্তর গাজার একটি স্কুলকে বাস্তুচ্যুতদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানেই থাকেন সামাহ মাতার ও তাঁর দুই শিশু ইউসুফ (৬) ও আমির (৪)। আমির সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত এবং বিশেষ খাবার ছাড়া বেঁচে থাকা কঠিন। অথচ এখন কোনো ডায়াপার, ফর্মুলা মিল্ক বা প্রয়োজনীয় শাকসবজি-ফল নেই।

সামাহ বলেন, “যুদ্ধের আগে ওদের স্বাস্থ্য ভালো ছিল। এখন তাদের ওজন ভয়াবহভাবে কমেছে। ইউসুফের ওজন ১৪ কেজি থেকে কমে এখন ৯ কেজি, আর আমির ৯ কেজি থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৬ কেজিতে।”
তিনি আরও বলেন, “চিনি নেই, ময়দাও খুব কষ্ট করে পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য কিছুই জোটে না। আমরা শুধু তাকিয়ে থাকি, কেউ যদি কিছু দিয়ে যায়।”
গতকাল সোমবার ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন আরও ৯৪ জন, আহত ৪৩৯। এর মধ্যে ২৯ জন ছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষ, যাঁরা ত্রাণ সংগ্রহে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। অনাহারে মৃত্যুর তালিকায় গত কয়েক সপ্তাহে যুক্ত হয়েছে অন্তত ১৮০ জন, যাদের মধ্যে ৯৩ জনই শিশু।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহত হয়েছেন ৬০,৯৩৩ জন। আহত হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ।
এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের কয়েক ডজন ডেমোক্র্যাট সদস্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি রো খান্না বিষয়টি নিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ নামও যুক্ত হয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাতেও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
গাজার পরিস্থিতি এখন আর শুধু একটি ভূখণ্ডের মানবিক সংকট নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক বিবেকের প্রশ্ন। যখন হাজার হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক সীমান্তে দাঁড়িয়ে, আর ভেতরে মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে; তখন শুধু মানবিক সহানুভূতির নয়, রাজনৈতিক সাহসেরও প্রয়োজন।
































